News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৫৫, ১২ জানুয়ারি ২০২৬
আপডেট: ২০:৫৬, ১২ জানুয়ারি ২০২৬

নির্লজ্জভাবে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা বিকৃত করা হয়েছিল: প্রধান উপদেষ্টা

নির্লজ্জভাবে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা বিকৃত করা হয়েছিল: প্রধান উপদেষ্টা

ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধারাবাহিকভাবে কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার করে সাজানো, নিয়ন্ত্রিত ও বিকৃত করা হয়েছে—তার বিস্তৃত ও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে। 

এই বাস্তবতা আর আড়ালে রাখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, নির্বাচন ডাকাতি যেন ভবিষ্যতে আর কখনো না ঘটতে পারে, সে জন্য এখনই কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন জমা দেয় জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন। প্রতিবেদন গ্রহণের পর কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনপ্রধান সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন, কমিশনের সদস্য শামীম আল মামুন, কাজী মাহফুজুল হক সুপণ, ব্যারিস্টার তাজরিয়ান আকরাম হোসেন এবং ড. মো. আব্দুল আলীম। 

উপদেষ্টাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান এবং সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছু কিছু জানতামও। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে, সিস্টেমকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে নিজেদের মনের মতো একটা কাগজে রায় লিখে দেওয়া হয়েছে—এগুলো জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার। এসবের পুরো রেকর্ড থাকা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, দেশের টাকা খরচ করে, মানুষের টাকায় নির্বাচন আয়োজন করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সে সময় এ দেশের মানুষ অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল, কিছুই করতে পারেনি। জনগণ যেন কিছুটা হলেও স্বস্তি পায়, সে জন্য এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তাদের চেহারা জাতির সামনে আনতে হবে। কারা করল, কীভাবে করল—সবকিছু জনসমক্ষে আসা জরুরি। নির্বাচন ডাকাতি যেন আর কখনো না ঘটতে পারে, আমাদের সেই স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে।

আরও পড়ুন: বিতর্কিত তিন নির্বাচনের তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনে তথাকথিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। তদন্তে উঠে এসেছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এই বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে ব্যাপক সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ হিসেবে উপস্থাপনের একটি বিশেষ মিশন গ্রহণ করে। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার গভীরতা অনুধাবন করতে না পেরে নির্বাচনে অংশ নেয়।

কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করে রাখা হয়। দলটিকে জেতাতে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের ‘অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ কাজ করছিল। এর ফলস্বরূপ কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশেরও বেশি দেখানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নির্বাচনকে কৃত্রিমভাবে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর অপকৌশল গ্রহণ করা হয়।

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, এই তিনটি নির্বাচনের ক্ষেত্রেই জালিয়াতির অভিনব পরিকল্পনাগুলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নেওয়া হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি বিশেষ কাঠামো গঠন করা হয়েছিল, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে নির্বাচন ব্যবস্থাকে কার্যত নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে সরিয়ে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সময়ে নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার প্রধান শক্তি।

তদন্ত প্রতিবেদনটির সঙ্গে কমিশনের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং নির্বাচন ডাকাতি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় করণীয় বিষয়ে একাধিক সুপারিশমালাও দেওয়া হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়