র্যাব ২৫% ও পুলিশ ২৩%: গুমের ভয়াবহ খতিয়ান দিল কমিশন
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে বিগত দেড় দশকে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অসদাচরণ নয়, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর একটি ‘সমন্বিত ও পদ্ধতিগত চর্চা’। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি।
সোমবার (০৫ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে কমিশনের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এই প্রতিবেদন ও সুপারিশমালার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, গুমের ঘটনায় এককভাবে সবচেয়ে বেশি দায়ী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। মোট গুমের প্রায় ২৫ শতাংশ র্যাবের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে। এর পরেই রয়েছে পুলিশের অবস্থান, যাদের বিরুদ্ধে ২৩ শতাংশ গুমের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই এবং এনএসআই-এর মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও ব্যাপক হারে এই অপরাধে লিপ্ত ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক। নিখোঁজদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরে এসেছেন, তাদের ৭৫ শতাংশই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ বিএনপির। আবার যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপির এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
কমিশনে দাখিলকৃত মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ এবং ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। কমিশন তদন্তের স্বার্থে বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ মোট ২২২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট-এর ধারা ১০-এ অনুযায়ী, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যে অভিযোগগুলো চার ধাপে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে পাঠানো হয়েছে। ২ থেকে ৫ দিনের স্বল্পকালীন গুমের অভিযোগগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পৃথক চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং আগামী ৬ মাসের মধ্যে এর অগ্রগতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিখোঁজদের ভাগ্য নির্ধারণে কমিশন সারাদেশের বিভিন্ন গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’, ক্রাইম সিন এবং ডাম্পিং প্লেস পরিদর্শন করেছে। মুন্সীগঞ্জে এমন এক বেওয়ারিশ কবরস্থানের সন্ধান পাওয়া গেছে যেখানে দাফনকৃত মরদেহের হাত পিছমোড়া করে বাঁধা এবং মাথায় গুলির চিহ্ন ছিল, যা গুমের শিকার ব্যক্তিদের দাফনের জোরালো প্রমাণ বহন করে। এছাড়া বরিশালের বলেশ্বর নদী এবং বরগুনার পাথরঘাটায় মরদেহ ফেলে দেওয়ার বা ‘ডাম্পিং প্রেস’-এর সন্ধান মিলেছে। অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তে একটি আন্তর্জাতিক মানের ডিএনএ ডাটাবেস গঠনের সুপারিশ করেছে কমিশন।
আরও পড়ুন: ৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দেবে: ইএএসডি
কমিশন ভারত থেকে ‘পুশইন’ বা ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের তথ্যও যাচাই করেছে। ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ধামরাইয়ের গুম হওয়া ব্যক্তি মোহাম্মদ রহমত উল্লাহকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ফেরত পাঠানোর একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে ভারতের কারাগারে আটক ৪ হাজার ৩৩৭ জন বাংলাদেশির তালিকার সঙ্গে গুম হওয়া ব্যক্তিদের নামের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
ভবিষ্যতে গুম প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করতে কমিশন বৈপ্লবিক কিছু সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো,
- র্যাব বিলুপ্তকরণ: গুমের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্ত করা।
- আইনি সংস্কার: ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন বাতিল বা মৌলিক সংশোধন এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের ১৩ ধারা বাতিল করা।
- সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার: অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রত্যাহার করা।
- জবাবদিহিতা ও প্রশিক্ষণ: সকল বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহিতায় আনা এবং বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
- স্মৃতি সংরক্ষণ: গুমের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ‘আয়নাঘর’ গুলোকে জাদুঘরে রূপান্তর করা।
- ক্ষতিপূরণ: ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
তারা জানান, গুমের পুনরাবৃত্তি রোধে ইতোমধ্যে ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স প্রিভেনশন অ্যান্ড রিড্রেস অর্ডিন্যান্স ২০২৫’ প্রণয়নে সহায়তা করেছে কমিশন। গত ৪ জানুয়ারি এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








