News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:০৭, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫

২০২৫ সালে চরম বিপর্যয়ে দেশের মানবাধিকার, মব জাস্টিসে মৃত্যু ১৯৭

২০২৫ সালে চরম বিপর্যয়ে দেশের মানবাধিকার, মব জাস্টিসে মৃত্যু ১৯৭

ফাইল ছবি

২০২৫ সালে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। বছরজুড়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বা ‘মব জাস্টিস’, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গণমাধ্যমের ওপর নজিরবিহীন হামলা এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় জনজীবন বিপর্যস্ত ছিল। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) তাদের বাৎসরিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কেবল ২০২৫ সালেই মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৯৭ জন, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

আসকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মব সহিংসতায় ১২৮ জনের মৃত্যু হলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৭ জনে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো মেয়াদে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে অন্তত ২৯৩ জন নিহত হয়েছেন।

ভৌগোলিক বিশ্লেষণ ও ভুক্তভোগী:

  • সর্বোচ্চ মৃত্যু: ঢাকা জেলায় ২৭ জন, গাজীপুরে ১৭, নারায়ণগঞ্জে ১১ এবং চট্টগ্রামে ৯ জন।
  • অন্যান্য জেলা: কুমিল্লায় ৮, ময়মনসিংহ, বরিশাল, নোয়াখালী, গাইবান্ধা ও শরীয়তপুরে ৬ জন করে এবং লক্ষ্মীপুর ও সিরাজগঞ্জে ৫ জন করে নিহত হন।
  • ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী: নিহতদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের ৭ জন, ৩ জন নারী এবং ১ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন।

প্রতিবেদনে বিশেষভাবে রংপুরের তারাগঞ্জের ঘটনার উল্লেখ করা হয়, যেখানে গত ৯ আগস্ট ভ্যান চুরির অপবাদে জুতা সেলাইকারী রুপলাল দাস ও ভ্যানচালক প্রদীপ দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আসক অভিযোগ করেছে, ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং স্থান ত্যাগ করেছিল।

২০২৫ সালকে সংবাদপত্রের ইতিহাসের অন্যতম কালো বছর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে পরিকল্পিত হামলা ও অগ্নিসংযোগকে ‘নজিরবিহীন’ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর ‘গুরুতর আঘাত’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী বছরজুড়ে ৩৮১ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ৩ জন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন এবং ৪ জনের মরদেহ রহস্যজনকভাবে উদ্ধার করা হয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলার শিকার হন ১১৮ জন এবং মামলার মুখোমুখি হয়েছেন ১২৩ জন। জুলাই অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক ৩২টি মামলায় ১৩৭ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: হাদিকে গুলি করা ফয়সালের ভিডিওবার্তা `এআই` দিয়ে তৈরি নয়

প্রতিবেদনে সাংবাদিক আনিস আলমগীর ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদের গ্রেফতারের ঘটনাকে ভিন্নমত দমনের কাঠামোগত প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৫ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যাও বেড়েছে। আসকের মতে, এ বছর ৩৮টি বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেছে (২০২৪ সালে ছিল ২১টি)। এর মধ্যে ২৬ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বা হেফাজতে নির্যাতনে এবং ১২ জন থানায় মারা গেছেন।

কারাগারের অভ্যন্তরেও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়েছে। দেশের বিভিন্ন কারাগারে এ বছর ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে (হাজতি ৬৯, কয়েদি ৩৮)। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। সাভারের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান সুজন এবং সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের জেল হেফাজতে মৃত্যু নিয়ে জনমনে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

বছরজুড়ে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং ৪,৭৪৪ জন আহত হয়েছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ ১৯২টি সংঘর্ষে ৩৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার চিত্রও ছিল উদ্বেগজনক। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ৪২টি হামলার ঘটনায় অন্তত ১ জন নিহত ও ১৫ জন আহত হন। এছাড়া ৩৩টি বাড়িঘর ভাঙচুর, ৩৬টি বসতঘরে অগ্নিসংযোগ এবং ৪টি মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। একটি বৌদ্ধ মন্দিরেও হামলা চালানো হয়েছে।

বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, মব সন্ত্রাসসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কমাতে না পারা সরকারের ব্যর্থতা। বড় গণ-আন্দোলনের পর অনিয়ম দেখা দিলেও এগুলোকে কোনোভাবেই ন্যায্য বলা যায় না।

আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবীর বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জবাবদিহির অভাব এবং মব তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্রে হামলা বা ভিন্নমতাবলম্বীদের হেনস্তা করা আইনের শাসনের ওপর আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের।

প্রতিবেদনের সমাপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক নিরাপত্তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে না উঠলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়