আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:২২, ২৬ জুন ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে  নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮৯

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে  নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮৯

ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্পে দেশজুড়ে মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছেছে। গত বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানী কারাকাসের পশ্চিমাঞ্চলে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা এই জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে ৫৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। 

শুক্রবার (২৬ জুন) দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

এর আগে সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা ২৩৫ জন এবং আহতের সংখ্যা ৪ হাজার ৩০০ জন বলে জানানো হলেও, সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী আহতের সংখ্যা ২ হাজার ৯৮০ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় প্রথম ভূমিকম্পটি ছিল ৭.২ মাত্রার, যার উৎপত্তিস্থল ছিল উপকূলীয় শহর মোরন থেকে ২১ কিলোমিটার পশ্চিমে, ভূগর্ভের ২২ কিলোমিটার গভীরে। এর মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর, ৪৫ কিলোমিটার দূরে ভূগর্ভের ১০ কিলোমিটার গভীরে ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় ও প্রধান কম্পনটি আঘাত হানে। ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের ভাষায় ডাবলেট বা জোড়া ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত এই বিপর্যয় ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে ১৯০০ সালের ২৯ অক্টোবরের (৭.৭ মাত্রা) পর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ধ্বংসাত্মক ঘটনা। ভূমিকম্প দুটির উৎপত্তিস্থল অগভীর হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক। ঘটনার দিন জাতীয় ছুটি থাকায় এবং মানুষজন বাড়িতে অবস্থান করায় হতাহতের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরা। প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার জনসংখ্যার এই শহরে শতাধিক বহুতল ভবন ধসে পড়েছে এবং ৭০ হাজারের বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজধানী কারাকাসেও বহু ভবন, স্থাপনা, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো ধসে পড়েছে। ভূমিকম্পের ফলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কারাকাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ট্রেন ও মেট্রো পরিষেবা। 

আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২৩৫

এছাড়া পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশটির সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলতি সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, এই দুর্যোগে প্রায় ৬৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার মধ্যে কেবল কারাকাসেই প্রায় ২০ লাখ মানুষ রয়েছেন। উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া জীবিতদের উদ্ধারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার গোল্ডেন উইন্ডো বা অনুকূল সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্ধার অভিযানে নিয়োজিতরা জানান, সময়ের সঙ্গে জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা এক উদ্বেগজনক তথ্যে জানিয়েছে, এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ৪৪ শতাংশ এবং এক লাখের বেশি প্রাণহানির আশঙ্কা অন্তত ৩০ শতাংশ রয়েছে।

ভেনেজুয়েলার সরকার দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় কারাকাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের একটি জরুরি মজুদ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতাল ও বাড়িঘর পুনর্গঠনের জন্য সরকার ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠন করেছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। 

জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, চিলি, এল সালভাদর, তুরস্ক, চীন, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল, কুকুর, অত্যাধুনিক রাডার এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে শুরু করেছে। এদিকে, এই সংকটের মুহূর্তে ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও জোরালো হচ্ছে। 

এখন পর্যন্ত নিহত ১৭ জন বিদেশি নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, যাদের মধ্যে পর্তুগাল, স্পেন, ব্রাজিল, চীন ও ইতালির নাগরিকরা রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে পরিবারের সদস্যরা বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন, আর বহু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করছেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়