নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:৪৭, ২৬ জুন ২০২৬

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডোরে নতুন সম্ভাবনা

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডোরে নতুন সম্ভাবনা

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে সংযুক্ত করে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোর (ইকোনমিক করিডোর) গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে চীন। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার (২৬ জুন) বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। বৈঠক শেষে দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এ তথ্য জানান।

মাহদী আমিন বলেন, দুই নেতার বৈঠকে কানেক্টিভিটি বা আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির প্রস্তাব এসেছে। এই করিডোরের মূল লক্ষ্য হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিধি বৃদ্ধি, আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক লেনদেন বাড়ানো এবং সড়ক, রেল ও নৌপথের সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি দুই দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে, তিনটি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও চীনের বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এবং একটি রাজনৈতিক দল পর্যায়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, সফরের ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে একটি যৌথ ইশতেহার প্রস্তুত করা হচ্ছে, যেখানে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এসব বিষয়ের মধ্যে থাকবে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন।

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের ধারণা নতুন নয়। এর আগে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব সামনে এসেছিল। তবে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই উদ্যোগ দীর্ঘদিন স্থবির ছিল। বর্তমানে ভারতকে বাদ দিয়ে চীন-মিয়ানমার সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি অর্থনৈতিক যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সম্ভাব্য এই করিডোর চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং থেকে মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে রাখাইন অঞ্চলের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। পরবর্তী ধাপে সড়ক ও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে এটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের বন্দর, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি বাড়াতে উৎপাদন সক্ষমতা ও সম্ভাবনাময় খাতগুলো চিহ্নিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, চীনের অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উৎপাদন কার্যক্রম স্থানান্তর করছে। এসব শিল্প বাংলাদেশে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের মানবসম্পদ ও কারিগরি সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নতুন বিনিয়োগ আনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশকে পাশে থাকার বার্তা শির

  • চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের উন্নয়নে আগ্রহ

বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দুই সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মোংলার উন্নয়নেও সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। মাহদী আমিন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন করে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যাতে এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, আশপাশের দেশগুলোর জন্যও ব্যবহারযোগ্য হয়।

একই সঙ্গে মোংলা বন্দরকে আরও আধুনিক, কার্যকর ও সেবামুখী করার বিষয়েও চীনের আগ্রহ রয়েছে বলে জানান তিনি।

  • তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহযোগিতা

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পেও সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। মাহদী আমিন জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনার পরিকল্পনা, কারিগরি সহায়তা, প্রকল্প নকশা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে চায় বেইজিং।

তিস্তা মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য হলো নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং নদীভাঙন কমানো। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রংপুর অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

  • শিক্ষা, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে শুধু অর্থনীতি ও অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন।

তিনি বলেন, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি, জ্ঞান বিনিময় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে তৃতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্ডারিন শিক্ষার প্রসার এবং কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন।

স্বাস্থ্য খাতেও সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে বেইজিং। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা, রোবটিক সার্জারি, হাসপাতাল স্থাপন এবং চিকিৎসা ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশি রোগীদের জন্য চীনে চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে চীন সহযোগিতা করতে চায় বলে জানান তিনি।

  • রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতার আশ্বাস

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে বৈঠকে। মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ চায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন।

এ বিষয়ে চীন মিয়ানমারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনায় সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানান তিনি।

  • প্রথমবার টু প্লাস টু সংলাপের উদ্যোগ

পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের নতুন ধরনের সমঝোতা হয়েছে বলেও জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনার ভিত্তিতে একটি টু প্লাস টু কাঠামো তৈরির বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান রেখে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে।

  • ব্রিকসে বাংলাদেশের আগ্রহকে স্বাগত জানাবে চীন

বাংলাদেশ ভবিষ্যতে ব্রিকস জোটে সদস্যপদের আবেদন করলে চীন সেটিকে স্বাগত জানাবে বলে জানিয়েছেন মাহদী আমিন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের ভূমিকা ও সহযোগিতার বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

  • দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বের ঘোষণা

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৈঠকে বলেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যায়ে নিতে চায় বেইজিং। তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।

চীনের পক্ষ থেকে সবুজ উন্নয়ন, স্বল্প কার্বন অর্থনীতি, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীনের গুরুত্ব তুলে ধরে অর্থনীতি, বাণিজ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। তিনি বাংলাদেশের এক চীন নীতির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

চার দিনের চীন সফরের শেষ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছে উভয় পক্ষ। সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়