ইরানে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৯৬০ জন জীবিত উদ্ধার
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিধ্বংসী বিমান হামলায় লণ্ডভণ্ড ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ইরানের অপূরণীয় মানবিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলার ফলে ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এখন পর্যন্ত ৯৬০ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (আইআরসিএস)।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সংস্থাটি তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা ও আল জাজিরার প্রতিবেদনে রেড ক্রিসেন্টকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত উদ্ধারকারী দলগুলো ১ হাজার ৭১১টি বিশেষ কারিগরি ও সরিয়ে নেওয়ার অভিযান পরিচালনা করেছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারকৃত ৯৬০ জনকে দ্রুততার সঙ্গে নিকটস্থ হাসপাতাল ও জরুরি সেবা কেন্দ্রগুলোতে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও অনেক মানুষ নিখোঁজ থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের জরুরি সেবা সংস্থার প্রধান মাজিদ মিয়াদফার হতাহতের ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, হামলায় বিপুল সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। যার মধ্যে অন্তত ২৫৮ জন নারী এবং ২২১ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছরের নিচে) রয়েছেন। নিহত শিশুদের মধ্যে ১৮ জনের বয়স পাঁচ বছরেরও কম। সামগ্রিকভাবে গত পাঁচ সপ্তাহের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দেশটিতে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
হামলায় ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। রেড ক্রিসেন্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৬৩০টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ আবাসিক ভবন এবং প্রায় ২৪ হাজার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অনেক বহুতল ভবন পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
আরও পড়ুন: লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলা, নিহত ৪
আঘাত হানা হয়েছে দেশটির স্বাস্থ্যসেবা খাতের ওপরও। যুদ্ধকালীন সময়ে হাসপাতাল, ল্যাবরেটরি, ফার্মেসি ও জরুরি ইউনিটসহ মোট ৩৩৯টি চিকিৎসাকেন্দ্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু কেন্দ্র স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জরুরি প্রয়োজন মেটাতে অনেকগুলো সাময়িকভাবে মেরামত করে পুনরায় চালু করা হয়েছে। ইরান সরকার এসব হামলার নথিপত্র ও প্রমাণ সংগ্রহ করছে, যা আন্তর্জাতিক বিচারিক সংস্থাগুলোর কাছে উপস্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব কেন্দ্রিক উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক অভিযান শুরু করে।
প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন এবং দেশটির সামরিক-বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট এলাকা এবং ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। বিশেষ করে ইরান কর্তৃক বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বিশ্ব বাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। উল্লেখ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
চরম উত্তেজনার মুখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
বর্তমান ঘোষণা অনুযায়ী, এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যে পরিমাণ মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী সমাধান ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া কঠিন। আপাতত ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার এবং বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষের ত্রাণ সহায়তা প্রদানই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








