News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:১১, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

ওপেক ছাড়ল আমিরাত, বিশ্ব তেল বাজারে বড় ধাক্কা

ওপেক ছাড়ল আমিরাত, বিশ্ব তেল বাজারে বড় ধাক্কা

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

বিশ্বজুড়ে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক অভাবনীয় ও নাটকীয় মোড় নিয়েছে। দীর্ঘ ৫৯ বছরের সম্পর্কের ইতি টেনে জ্বালানি তেল উত্তোলন ও রপ্তানিকারক দেশগুলোর প্রভাবশালী জোট ‘ওপেক’ (OPEC) এবং ‘ওপেক প্লাস’ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। 

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ওয়াম’ (WAM) এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছে। 

আগামী ১ মে থেকে এই পদত্যাগ কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। ওপেকের কার্যত নেতা সৌদি আরবের জন্য একে একটি বড় ধরনের কৌশলগত ও কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ওপেকের সদস্য থাকার পর আমিরাতের এই প্রস্থান জোটটির ঐক্যে স্পষ্ট ফাটল তৈরি করেছে। ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ওপেক দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের এক-তৃতীয়াংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে এবং উৎপাদন কোটা নির্ধারণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রভাবিত করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। তবে আমিরাতের মতো বড় উৎপাদনকারী দেশের সরে যাওয়া এই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ও সমন্বিত কৌশলকে দুর্বল করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক অসন্তোষ বড় ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। 

উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। 
আমিরাতের অভিযোগ, চলমান সংঘাতের সময় ইরানের ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে তাদের সুরক্ষা দিতে প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলো এবং ‘গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল’ (জিসিসি) পর্যাপ্ত সামরিক বা রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেনি।

আরও পড়ুন: মার্কিন আধিপত্যের দিন শেষ: ইরান

এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাসের বক্তব্যে। সোমবার এক সম্মেলনে তিনি বলেন, লজিস্টিক সহায়তায় জিসিসিভুক্ত দেশগুলো সক্রিয় থাকলেও রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে তাদের অবস্থান বর্তমানে ঐতিহাসিকভাবে নিম্নস্তরে রয়েছে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, আরব লীগের দুর্বল অবস্থান প্রত্যাশিত হলেও জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর এমন নিষ্ক্রিয়তা তাকে বিস্মিত করেছে। মূলত এই নিরাপত্তাহীনতা এবং জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই ওপেক ত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে আবুধাবি।

১৯৬৭ সালে ওপেকের সদস্য হওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাত বেরিয়ে যাওয়ার ফলে জোটটির সদস্য সংখ্যা এখন ১১-তে নেমে আসবে। ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জোট বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমানে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি যখন তেলের নজিরবিহীন অস্থিরতা ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন আমিরাতের মতো বড় উৎপাদনকারী দেশ সরে যাওয়ায় তেলের উৎপাদন ও মূল্য নির্ধারণে ওপেকের একক আধিপত্য বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়লো। আমিরাত জানিয়েছে, তারা তাদের উৎপাদন নীতি ও সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন করে বাজারের জরুরি চাহিদা মেটাতে এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক রূপকল্প বাস্তবায়নে আরও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। ১ মে থেকে আমিরাত তার নিজস্ব কৌশল অনুযায়ী তেল উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার মতে, আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বড় ধরণের ‘কৌশলগত জয়’। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ওপেকের কঠোর সমালোচনা করে আসছেন এবং জোটটির বিরুদ্ধে কৃত্রিমভাবে তেলের দাম বাড়িয়ে বিশ্বকে শোষণ করার অভিযোগ তুলেছেন। 

ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, মার্কিন সামরিক বাহিনী যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিরাপত্তা দিচ্ছে, সেখানে ওপেক চড়া দাম বজায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করছে। ওয়াশিংটনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে আমিরাতের এই পদক্ষেপে ওপেকের একাধিপত্য দুর্বল হবে, যা ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের চাপের সরাসরি প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে। 

বুধবার (২৯ এপ্রিল) ভিয়েনায় ওপেকের নির্ধারিত বৈঠকের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আমিরাতের এই ঘোষণা জোটের ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়