News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:১১, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬

খামেনির পতনে ভুগবে ভারত

খামেনির পতনে ভুগবে ভারত

ফাইল ছবি

সম্প্রতি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনব্যবস্থাকে ঘিরে তৈরি হওয়া চরম অনিশ্চয়তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ভারতের নীতিনির্ধারকদের জন্য তেহরানের বর্তমান পরিস্থিতি এক গভীর সংকটের বার্তা দিচ্ছে। ভৌগোলিক বাস্তবতা ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে ইরান দীর্ঘকাল ধরে ভারতের কাছে মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের প্রধান ‘গেটওয়ে’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ফলে দেশটিতে চলমান ডামাডোল ভারতের কয়েক দশকের কূটনৈতিক শ্রম এবং চাবাহার বন্দরকে কেন্দ্র করে করা শতকোটি ডলারের বিনিয়োগকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান ভারতের জন্য স্থলপথ বন্ধ রাখায় নয়াদিল্লির সামনে কার্যত একমাত্র বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে তেহরান। এই প্রেক্ষাপটে চাবাহার বন্দর প্রকল্প এবং শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও ইরানের সম্পর্ক কখনোই আদর্শগত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে ছিল না; বরং এটি কৌশলগত স্বার্থ ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারে ইরান ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলসেতু হিসেবে কাজ করেছে। চাবাহার বন্দর প্রকল্পের মাধ্যমে নয়াদিল্লি সরাসরি আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছিল। তবে ইরানের বর্তমান টালমাটাল পরিস্থিতি এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা বা এমন কোনো সরকার ক্ষমতায় এলে, যারা ভারতের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন নয়, নয়াদিল্লির বহু বছরের কৌশলগত প্রচেষ্টা বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে।

শুধু বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সংযোগ নয়, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষায়ও ইরানের ভূমিকা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শিয়া-প্রধান ইরান পরোক্ষভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের প্রভাব সীমিত রাখতে ভারতকে সহায়তা করেছে। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরানের অস্থিতিশীলতা কেবল দেশটির ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের নতুন বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার হুমকিতে ভারতীয় রফতানিকারকরা বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন। 

গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই হাজার কোটি রুপির ভারতীয় পণ্য বর্তমানে বিভিন্ন বন্দরে আটকে রয়েছে।

নয়াদিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতনের পর ইরানে কোনো উগ্রবাদী বা চরমভাবে অস্থিতিশীল সরকার ক্ষমতায় এলে তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। পাশাপাশি, যদি অরাজক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইরান চীনের কৌশলগত প্রভাবের অধীনে চলে যায়, তাহলে ভারতের অবস্থান আরও দুর্বল হবে। খামেনির ক্ষমতায় থাকা বা না থাকার চেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছে ইরানের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা, এবং এই অস্থিরতা ভারতের কয়েক দশকের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও বিপুল অংকের বিনিয়োগকে বিপন্ন করতে পারে।

আরও পড়ুন: ‘ইসলামী শাসনের পতন হলে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে স্বাধীন ইরান’

এ ছাড়া ভারতের পশ্চিমমুখী যোগাযোগের কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু হলো চাবাহার বন্দর, যা পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে স্থল ও রেলপথে সংযোগ স্থাপন নিশ্চিত করে। তেহরানের শিয়া নেতৃত্ব পাকিস্তানের প্রভাব সীমিত রাখায় ভারতের জন্য ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নব্বই ও ২০০০-এর দশকে তালেবানবিরোধী অবস্থান এবং কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক কৌশল মোকাবেলায় ইরান ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনৈতিকভাবে, ইরান ভারতের অষ্টম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। গত এক বছরে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ১৩০ থেকে ১৭০ কোটি মার্কিন ডলারের মধ্যে হয়েছে। চাবাহার ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ভারতের বিনিয়োগ এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রকল্পের কিছু অংশ পুনর্গঠন করতে হয়েছে। শাসন পরিবর্তন হলে এই বিনিয়োগ সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

এ ক্ষেত্রে চীনের প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। ২০২১ সালে ইরান-চীনের ২৫ বছরের কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২০২৫ সালে চীন ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ছিল; সেই বছর চীনে ইরানি পণ্যের রপ্তানি ১৪.৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা চাবাহারের ভারতীয় উপস্থিতির প্রভাব সীমিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাবেক কূটনীতিক নীরূপমা মেনন রাও পরামর্শ দিয়েছেন যে নয়াদিল্লির অবস্থান হওয়া উচিত পরিমিত, সতর্ক এবং বহু সম্ভাব্য পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রস্তুত। 

তিনি বলেন, প্রথম দায়িত্ব হলো ভারতীয় নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা, তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলা এবং একাধিক সম্ভাব্য দৃশ্যপট ধরে কৌশল তৈরি করা। অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়লে তা জ্বালানি বাজার, নৌপথ, প্রবাসী নিরাপত্তা ও চরমপন্থীদের ওপর দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ভারতের কৌশল হওয়া উচিত—সতর্কতা, ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং বিভিন্ন দিক থেকে মূল্যায়ন, যাতে সংকটের মধ্যে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা বা অনুমান এড়িয়ে যাওয়া যায়।

সূত্র: নিউজ২৪, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়