আবারও পরিবর্তন হতে পারে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার সূচি
ফাইল ছবি
২০২৭ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ঘোষিত সময়সূচি জনআকাঙ্ক্ষা ও শিক্ষার্থী স্বার্থ সুরক্ষায় আবারও পরিবর্তন হতে পারে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। পবিত্র রমজান মাসের পবিত্রতা ও আইনি বাধ্যবাধকতা রক্ষা করতে গিয়ে পরীক্ষার সময় প্রায় এক মাস এগিয়ে এনে আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হলেও, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন স্তরে তৈরি হওয়া তীব্র আলোচনা-সমালোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মুখে সরকার এই অবস্থান থেকে সরে আসার নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে।
মঙ্গলবার (০২ জুন) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী সভা শেষে এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিশেষ বৈঠক সম্পন্ন করে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শিক্ষামন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের এই নমনীয় ও প্রগতিশীল অবস্থানের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান। এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ৭ জানুয়ারি শুরু করার একটি প্রাথমিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে বর্তমানে দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকার কোনো একক সিদ্ধান্তে বা চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে জাতীয় শিক্ষাসূচি সাজাতে চায় না। এর আগে যখন ২০২৭ সালের ৭ জানুয়ারি পরীক্ষার দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়েছিল, তখন শিক্ষা খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার, শিক্ষাবিদ ও অংশীজনদের সঙ্গে ব্যাপক ও বিস্তৃত আলোচনার মাধ্যমেই সেই সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল আসন্ন রমজান মাসের কারণে যেন পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় কোনো বিঘ্ন না ঘটে এবং শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সেশন জটের কবলে না পড়ে।
তবে রুটিন ঘোষণার পর থেকে সাধারণ মানুষ, অভিভাবক ও বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরণের যৌক্তিক ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে।
গণতান্ত্রিক ও গণমুখী সরকার হিসেবে জনমতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও নানামুখী আলোচনা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। অংশীজনরা যদি মনে করেন এই সূচিতে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি বা প্রস্তুতিতে বড় কোনো সংকট হতে পারে, তবে তাদের দাবির মুখে এই সময়সূচি আমরা অবশ্যই পুনর্বিবেচনা ও পরিবর্তন করব। আমরা প্রয়োজনে পাবলিক ওপেনিয়ন বা গণমত যাচাই করতে আবারও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করব।
আরও পড়ুন: ২০২৬ সালের এইচএসসি ফরম পূরণের সময় বাড়ল
শিক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে রমজান মাসকে কেন্দ্র করে পরীক্ষার সময়সূচি এক মাস এগিয়ে আনার পেছনের মূল প্রশাসনিক ও প্রায়োগিক প্রেক্ষাপটটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক মহাপরিকল্পনা ছিল ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে নিয়মিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা আয়োজন করার। কিন্তু চন্দ্র মাসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মার্চের শুরুতে রমজান মাস শুরু হয়ে যাওয়ার একটি ধর্মীয় ও বাস্তব পরিস্থিতি রয়েছে। যদি নির্ধারিত নিয়মে ফেব্রুয়ারির শেষে পরীক্ষা শুরু করা হতো, তবে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে তা শেষ করা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না এবং অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলো রোজার ঈদের পরে অর্থাৎ মে মাসে নিয়ে যেতে হতো। এর ফলে শিক্ষার্থীরা এক দীর্ঘমেয়াদি ও মনস্তাত্ত্বিক সেশন জটে পড়ে যেত, যা তাদের সামগ্রিক শিক্ষাজীবনকে বাধাগ্রস্ত করত। এই মহাসংকট এড়াতে এবং রোজার আগেই সমস্ত পরীক্ষা সম্পন্ন করার মহৎ উদ্দেশ্যে পরীক্ষা এক মাস এগিয়ে এনে ৭ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশের সচেতন নাগরিক ও অংশীজনদের বড় একটি অংশ দাবি তুলছেন যে, তাড়াহুড়ো করে জানুয়ারি মাসে পরীক্ষা শেষ করার চেয়ে রোজার স্বাভাবিক আবহ শেষ হওয়ার পর স্বস্তিদায়ক পরিবেশে পরীক্ষা নেওয়াটাই বেশি যুক্তিযুক্ত হবে। এখন সবাই বলছেন রোজার পরে পরীক্ষা শেষ করতে, তাই সামগ্রিক আলোচনার মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত রূপরেখা ঠিক করা হবে।
সূচি পরিবর্তনের এই নতুন সম্ভাবনার সাথে মন্ত্রী আরেকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপরিহার্য শর্তের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, যা হলো শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম বা সিলেবাসের পূর্ণাঙ্গ সমাপ্তি।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, কেবলমাত্র জনমতের ওপর ভিত্তি করে বা আবেগের বশবর্তী হয়ে তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, কারণ এর সাথে শিক্ষার গুণগত মান ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জড়িত।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মানুষের মতামত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনিভাবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কারিকুলাম ও নির্ধারিত সিলেবাস কাভার হওয়াটা সমানভাবে জরুরি। উইথআউট সিলেবাস বা পাঠ্যসূচি সম্পূর্ণ শেষ না করে কোনো অবস্থাতেই একটি জাতীয় পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারে না। ফলে, নতুন কোনো তারিখ নির্ধারণের আগে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রতিটি বিদ্যালয়ের সিলেবাসের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হবে, যাতে পরীক্ষা এগিয়ে আনা বা পিছিয়ে নেওয়ার কারণে পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে কোনো প্রকার ঘাটতি না থাকে।
একই সাথে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি সুনির্দিষ্ট এবং আন্তর্জাতিক মানের কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনতে এবং বিগত কয়েক বছরের বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের কারণে তৈরি হওয়া সেশন জটকে স্থায়ীভাবে বিদায় করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি সুদূরপ্রসারী রোডম্যাপ তৈরি করছে বলে জানান তিনি। সরকার পরিস্থিতি বিবেচনা করে রুটিন পুনর্বিবেচনার দরজা সম্পূর্ণ খোলা রেখেছে এবং খুব দ্রুতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেশবাসীকে জানানো হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








