News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:০২, ২ জুন ২০২৬
আপডেট: ১৮:৪৯, ২ জুন ২০২৬

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নরওয়ের ভূমিকা জোরদারের আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নরওয়ের ভূমিকা জোরদারের আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকোন আরাল্ড গুলব্র্যান্ডসেনের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

মঙ্গলবার (০২ জুন) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর নিজস্ব কার্যালয়ে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে বাংলাদেশ ও নরওয়ের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বিষয়, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, শিক্ষাবৃত্তি এবং মিয়ানমার থেকে বলপ্রয়োগপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।

বৈঠকের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে নরওয়ের প্রারম্ভিক স্বীকৃতি প্রদানের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী সময়ে এ দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে দেশটির ধারাবাহিক অংশীদারিত্ব ও সমর্থনের কথা স্মরণ করে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। 

মন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈদেশিক নীতিতে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং দেশের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাকে এই নীতির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সাক্ষাৎকালে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তনের কথা জানান। রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, নরওয়ে এখন চিরাচরিত দাতা-সংস্থার মতো উন্নয়ন সহযোগিতা কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও পারস্পরিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দিচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরওয়ের এই দূরদর্শী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান এবং ইউরোপের এই বাজারে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি নরওয়ের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাইরেও উচ্চ-মূল্যের পণ্য যেমন ওষুধ শিল্প, চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) সেবা, পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্য এবং ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের উদীয়মান খাতসমূহ, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ নির্মাণ এবং আধুনিক প্যাকেজিং শিল্পে নরওয়ের বড় বড় শিল্পোদ্যোক্তাদের বড় আকারের বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

বৈঠকের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতের উন্নয়ন। 

আরও পড়ুন: রুশ সেনাদের কাছে বাংলাদেশি ৩০ যুবককে ‘বিক্রি’, এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় নরওয়ের আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের প্রশংসা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। এই সংকট উত্তরণে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) এবং নরফান্ডের ক্লাইমেট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব কম-কার্বন প্রযুক্তির প্রকল্পগুলোতে দ্বিপাক্ষিক আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা আরও বৃদ্ধির ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। এর পাশাপাশি দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে শিক্ষা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং যৌথ গবেষণার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিময় বাড়ানোর তাগিদ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিশেষ করে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে নরওয়ের সরকারি শিক্ষাবৃত্তির আওতা আরও সম্প্রসারণের জন্য তিনি রাষ্ট্রদূতের প্রতি অনুরোধ জানান। এ সময় নরওয়েতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর চমৎকার ও দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করা হয়, যা দুই দেশের মধ্যকার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাচ্ছে বলে বৈঠকে একমত পোষণ করা হয়।

আলোচনার অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল এজেন্ডা ছিল বাংলাদেশে চলমান রোহিঙ্গা সংকট। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া ১০ লক্ষাধিক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) প্রতি নরওয়ে সরকারের ধারাবাহিক মানবিক সহায়তা এবং বাংলাদেশে নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের (NRC) সক্রিয় মানবিক কার্যক্রমের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। 

তবে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরালো ভাষায় সতর্ক করে বলেন যে, রোহিঙ্গাদের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্থানীয় পরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত বড় ও দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। 

বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য এই বোঝা বহন করতে পারবে না উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা নাগরিকদের সম্পূর্ণ নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ, টেকসই এবং আন্তর্জাতিকভাবে তদারকিযোগ্য উপায়ে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে নরওয়ে এবং জাতিসংঘসহ সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও দৃশ্যমান ও জোরালো কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে হবে।

নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকোন আরাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন বাংলাদেশ ও নরওয়ের মধ্যকার অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। 

তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধান এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক সুরক্ষায় নরওয়ে সবসময় পাশে থাকবে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক ফোরামে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দুই দেশের এই একাত্মতা, সমন্বয় ও পারস্পরিক সহযোগিতা আগামী দিনগুলোতে আরও জোরালোভাবে অব্যাহত থাকবে।

উচ্চপর্যায়ের এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে নরওয়েজিয়ান দূতাবাসের পলিটিক্যাল অ্যাডভাইজার সারোয়ার জাহান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, রাজনৈতিক-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব রেবেকা খান এবং রাজনৈতিক-৩ শাখার উপসচিব মো. আমিনুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়