News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:২৯, ২ জুন ২০২৬

৩ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা

৩ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা

ছবি: নিউজবাংলাদেশ

দেশের ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষত তথা খেলাপি ঋণের সমস্যা ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এসে আরও ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুনঃতফসিল সুবিধা, বিশেষ নীতি সহায়তা এবং রাজনৈতিক নানা ছাড়ের পরও ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ও খেলাপি ঋণের পাহাড় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অঙ্কে পৌঁছেছে। গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই উল্লম্ফনের ফলে গত মার্চ ২০২৬ শেষে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত বিতরণকৃত মোট ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণের রেকর্ড ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। মাত্র এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের মার্চে এই শ্রেণিকৃত ঋণের গ্রস হার ছিল ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। এর অর্থ হলো, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশের ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পুরো আর্থিক খাতের জন্য এক চরম আশঙ্কাজনক চিত্র।

বর্তমান পরিসংখ্যানের সাধারণ ও রূঢ় সমীকরণ হলো দেশের ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩২ টাকার বেশি এখন শ্রেণিকৃত বা সমস্যাগ্রস্ত। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের যে অর্থ ঋণ হিসেবে বাজারে ছেড়েছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন ফেরত পাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। 

অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু ব্যাংকগুলোর তারল্য বা মুনাফায় ধস নামাবে না, বরং পুরো সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেবে। কারণ, ব্যাংকিং খাতের প্রধান চালিকাশক্তি হলো আমানত সংগ্রহ করে তা উৎপাদনশীল খাতে পুনর্বিতরণ করা। কিন্তু ঋণের এই বিশাল অংশ আটকে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা যেমন সংকুচিত হচ্ছে, তেমনি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে সার্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি মন্দার আবর্তে আটকা পড়ার উপক্রম হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শ্রেণিকৃত ঋণের পাশাপাশি প্রকৃত খেলাপি ঋণের অঙ্কও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। মার্চ ২০২৬ শেষে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ। মাত্র তিন মাস আগে ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে এই অঙ্ক ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা (তিন মাসে বৃদ্ধি ১৯ হাজার ২৭৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা)। তবে এক বছরের ব্যবধানে এই চিত্রটি আরও শিউরে ওঠার মতো; কারণ ২০২৫ সালের মার্চে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ছিল ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সমস্যাগ্রস্ত ঋণের সিংহভাগই এখন আদায়-অযোগ্য বা ‘মন্দ ও ক্ষতিজনক’ ঋণের আস্তাকুঁড়ে পতিত হয়েছে। 

তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক’ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট শ্রেণিকৃত ঋণের ৯৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর অর্থ হলো, আটকে যাওয়া ঋণের প্রায় পুরোটাই এমন এক অন্ধকার গহ্বরে চলে গেছে, যেখান থেকে অর্থ উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বললেই চলে।

খেলাপি ঋণের এই দৃশ্যমান পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে আছে আরেকটি বড় টাইমবোমা, যা হলো ‘স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট’ (এসএমএ) বা সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, মার্চ ২০২৬ শেষে এই ধরনের সম্ভাব্য খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১২০ কোটি টাকা, যা তিন মাস আগে অর্থাৎ ডিসেম্বর ২০২৫-এ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে এই খাতে প্রায় ২৮ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্পষ্ট যে, আগামী প্রান্তিকগুলোতে খেলাপি ঋণের বহর আরও বড় হতে চলেছে।

এদিকে, খেলাপি ঋণের এই জোয়ারের কারণে ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা ‘প্রভিশন’ রাখার ক্ষেত্রে এক বিশাল সুনামি তৈরি হয়েছে। মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংক খাতের মোট রক্ষিতব্য প্রভিশন ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকগুলো তাদের ভঙ্গুর আর্থিক দশার কারণে সংরক্ষণ করতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে আকাশচুম্বী ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকায়, যা দুই লাখ কোটির মনস্তাত্ত্বিক সীমা পার করেছে। মাত্র তিন মাস আগে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। তিন মাসে ঘাটতি বেড়েছে ১৪ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তিকে পুরোপুরি দুর্বল করে দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দেশের ব্যাংকিং ইমেজকে তলানিতে নিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৪.৭৭ বিলিয়ন ডলার

মালিকানাভিত্তিক ব্যাংকগুলোর খতিয়ান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বরাবরের মতোই রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। মার্চ ২০২৬ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকাই শ্রেণিকৃত। ফলে এসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে (যা গত ডিসেম্বরে ছিল ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ)। অর্থাৎ, সরকারি ব্যাংকের বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের প্রায় ৪৬ টাকাই এখন সংকটাপন্ন। 

অন্যদিকে, সংখ্যার বিচারে দেশের সবচেয়ে বড় ঋণের পোর্টফোলিও বহনকারী ৪৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অবস্থাও দ্রুত অবনতিশীল। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট ১৩ লাখ ৮৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৮২ কোটি টাকাই এখন শ্রেণিকৃত। ফলে বেসরকারি খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের হার তিন মাসের ব্যবধানে ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ৩০ দশমিক ১১ শতাংশে ঠেকেছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৬ কোটি টাকা, যা পরিমাণের দিক থেকে পুরো দেশের মোট খেলাপি ঋণের সবচেয়ে বড় অংশ।

ব্যতিক্রম নয় বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোও; তাদের খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ। তবে দেশের এই চরম আর্থিক অস্থিরতার মধ্যেও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কঠোর ঋণ মূল্যায়ন ও করপোরেট সুশাসনের কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলো নিজেদের বেশ সুরক্ষিত রাখতে পেরেছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ৬৭ হাজার ৬২৮ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে শ্রেণিকৃত ঋণ মাত্র ৩ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং নেট শ্রেণিকৃত ঋণের হার মাত্র শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেটা অনুযায়ী, বিগত এক বছরে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ বিতরণের পরিধি কিছুটা বেড়েছে। মার্চ ২০২৫ শেষে ব্যাংকিং খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা, যা মার্চ ২০২৬ এ ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এক বছরে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৮২ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে (৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ) এবং সবচেয়ে কম বিদেশী ব্যাংকগুলোতে (০.৯২ শতাংশ)। তবে অর্থনীতির সাধারণ নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঋণের পরিমাণ বাড়লেও তার গুণগত মান বা কোয়ালিটি তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নতুন যে ঋণ বিতরণ হচ্ছে, তার একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত আদায় না হয়ে পুনরায় খেলাপি ঋণের খাতায় নাম লেখাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণের এই সর্বগ্রাসী রূপের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা দায়ী। প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, লবিং ও দুর্বল ঋণ মূল্যায়নের কারণে অযোগ্য ও নামসর্বস্ব উদ্যোক্তাদের বড় বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে, যা এখন আর আদায়ের কোনো উপায় নেই। দ্বিতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনীতির মন্দা, ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হারের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীরাও সময়মতো ঋণ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। তৃতীয়ত, অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা যেসব বিশেষ নীতি সহায়তা, পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধা নিয়ে সাময়িকভাবে নিজেদের নিয়মিত দেখিয়েছিলেন, সেগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই ঋণগুলো আবারও খেলাপির খাতায় ফিরে এসেছে।

এই পরিস্থিতি আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বহুমুখী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে প্রথমত, ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমায় মূলধন ঘাটতি তীব্র হবে, যা আমানতকারীদের মনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, খেলাপি ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে ভালো গ্রাহকদের ওপর ঋণের সুদের হারের চাপ আরও বাড়বে, যা নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবে। সর্বোপরি, ডুবতে বসা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে করদাতাদের টাকা দিয়ে বারবার মূলধন জোগান দিতে হবে, যা দেশের সার্বিক বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। 

বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট মত, ব্যাংকিং খাতে অবিলম্বে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বাধীন ও কঠোর আইনি সংস্কার না করা গেলে খেলাপি ঋণের এই উল্কাগতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়