সাভারে এসআই হত্যা, প্রধান আসামির পর গ্রেফতার আরও ১০
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের বরদেশী এলাকায় পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আলতাব হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলায় আরও ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে মামলার প্রধান আসামি জহিরুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়।
জহিরুলের দেওয়া তথ্য এবং গোয়েন্দা তদন্তের ভিত্তিতে রবিবার রাতে সাভার, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে এই ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এদিকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত জহিরুলের ব্যক্তিগত গাড়িটিও রবিবার রাতে সাভার পৌরসভার উত্তরপাড়া থেকে জব্দ করেছে পুলিশ।
রবিবার (০৬ সেপ্টেম্বর) রাতে গ্রেফতার হওয়া ১০ জনের মধ্যে এজাহারভুক্ত ছয়জন হলেন আলাউদ্দিন (২৬), আপন (৩০), জিহাদ (২০), ইমরান (২৬), নূর মোহাম্মদ রুদ্র (২৪) এবং রাকিব মিয়া (২৮)। এ ছাড়া এজাহারবহির্ভূত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তারা হলেন সাব্বির আহমেদ (২৪), ওয়াসিম (৪০), বিল্লাল হোসেন (৩০) এবং দেলোয়ার হোসেন (২৮)।
সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) মামলার প্রধান আসামি জহিরুল ইসলামকে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
অন্যদিকে, বিল্লাল হোসেন ও দেলোয়ার হোসেনকে আদালতে পাঠানো হলেও তাদের রিমান্ড শুনানি না করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। বাকি আটজনকে থানায় রাখা হয়েছে এবং আজ মঙ্গলবার তাদের আদালতে সোপর্দ করে ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার সালেহপুর সেতুসংলগ্ন মদিনা হাউজিং এলাকাটি স্থানীয়ভাবে বালুর মাঠ নামে পরিচিত। বেশ নির্জন ও ফাঁকা এই এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের নিরাপদ আড্ডাস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০ থেকে ৩০ সদস্যের এই চক্রটি আমিনবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য শামসুল হকের দুই ছেলে আপন ও জিহাদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। মামলার মূল অভিযুক্ত জহিরুল ইসলামের সঙ্গে এই দুই ভাইয়ের গভীর সখ্য রয়েছে।
আরও পড়ুন: সাভারে অটোরিকশাচালককে রক্ষা করতে গিয়ে এসবি কর্মকর্তা খুন
অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যে, এই চক্রের প্রায় প্রতিটি সদস্য এবং তাদের পরিবারের একাধিক নারী সদস্যও সরাসরি মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। প্রধান আসামি জহিরুলের মা রুকি বেগমের বিরুদ্ধে অন্তত ১৮টি মাদকের মামলা রয়েছে। একইভাবে গ্রেফতার বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধেও একাধিক মাদকের মামলা রয়েছে এবং তিনি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মাদক ব্যবসার কথা স্বীকার করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আপন ও জিহাদের মা জাহি বেগমও একাধিকবার মাদকসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা যায়, গত শনিবার রাত সাড়ে সাতটার দিকে মূল অভিযুক্ত জহিরুল ইসলাম তার ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার চালিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক থেকে বরদেশী এলাকার মদিনা হাউজিংয়ে প্রবেশ করছিলেন। এ সময় তার সঙ্গে গাড়িতে ছিলেন মজিবর, কাশেম, আলমগীর ও মাসুদ। হাউজিংয়ের ভেতরে একটি অটোগ্যারেজের সামনে পৌঁছালে রাস্তার দুই পাশে দুটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দাঁড়ানো থাকায় জহিরুলের গাড়ি চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এই সামান্য বিষয়টিকে কেন্দ্র করে গ্যারেজের মালিক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে জহিরুলের বাকবিতণ্ডা বাধে। একপর্যায়ে মেজাজ হারিয়ে জহিরুল অটোগারেজ মালিককে চড়-থাপ্পড় মারেন।
ঘটনার সময় পাশেই একটি মসজিদ থেকে এশার নামাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন এসবির এসআই আলতাব হোসেন। তিনি অহেতুক এক সাধারণ নাগরিককে মারধরের তীব্র প্রতিবাদ জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জহিরুল ও তার সহযোগীরা পুলিশ কর্মকর্তা আলতাব হোসেনের ওপরও চড়াও হন এবং মারধর শুরু করেন। প্রাণ বাঁচাতে আলতাব হোসেন দ্রুত পাশেই তাদের নিজেদের মালিকানাধীন একটি কারখানার ভেতর গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু হামলাকারীরা ক্ষান্ত না হয়ে সংঘবদ্ধভাবে ওই কারখানার ভেতরে ঢুকে পুনরায় হামলা চালায় এবং এসআই আলতাব ও তার ছেলেকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম জানান, নিহত পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামিসহ মোট ১১ জনকে এ পর্যন্ত আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অপরাধীরা একটি সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের সদস্য এবং তাদের পারিবারিক ইতিহাসেও অপরাধের নজির রয়েছে। পলাতক অন্যান্য আসামিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য সাভার ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








