সিদ্ধার্থ-মুগ্ধের ডোপ টেস্ট নেগেটিভ
ছবি: সংগৃহীত
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ এসেছে। পুলিশ ও মেডিকেল সূত্র জানিয়েছে, কারাগার থেকে সংগ্রহ করা আসামিদের প্রস্রাবের নমুনায় ইয়াবা, গাঁজা কিংবা অন্য কোনো মাদকের কোনো ধরনের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
তবে হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৯ দিন পর নমুনা সংগ্রহ করায় এবং চিকিৎসকদের মতে মাদকের উপস্থিতি শরীরে স্থায়ী হওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকায় এই নেগেটিভ রিপোর্ট দিয়ে ঘটনার রাতে আসামিরা মাদকাসক্ত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। ফলে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলা ও এর পেছনের মোটিভ নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত ২১ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা দেবী, ছেলে এবং মেয়ের হাত-পা বাঁধা ও রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ২২ আগস্ট সকালে পুলিশ মরদেহগুলো উদ্ধার করার পর পুরো দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরবর্তী সময়ে মামলাটির ছায়া তদন্ত ও মূল দায়িত্বভার অর্পণ করা হয় রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) ওপর। তদন্তের ধারাবাহিকতায় পুলিশ প্রতিবেশী দুই যুবক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করে।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, গ্রেফতারের পর এই দুই আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যানুযায়ী, ঘটনার রাতে আসামিরা ইয়াবা সেবন করার উদ্দেশ্যে গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই মূলত হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দিতে মাদকাসক্তির বিষয়টি সামনে আসায় তদন্তের স্বার্থে তাদের ডোপ টেস্ট করানোর সিদ্ধান্ত নেয় গোয়েন্দা পুলিশ। আদালতের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট অনুমতি পাওয়ার পর গত রবিবার (৩০ আগস্ট) রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ডোপ টেস্টের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং আসামিদের ওপর সম্ভাব্য জনরোষ বা মব সৃষ্টির আশঙ্কা এড়াতে তাদের কারাগার থেকে বাইরে না এনে, রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের সহযোগিতায় ল্যাবের টেকনোলজিস্ট ও সহকারী ডিবি কর্মকর্তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানেই কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দুই আসামির প্রস্রাবের নমুনা বা ইউরিন স্পেসিমেন সংগ্রহ করা হয় এবং তা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়।
আরও পড়ুন: রংপুরে আলোচিত চার খুনের তদন্তে গাফিলতির সুযোগ নেই
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী ডোপ টেস্টের ফলাফল নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, কারাগার থেকে সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষা করে তাতে কোনো ধরনের মাদকের অস্তিত্ব মেলেনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক জিন্নাত আলীও নিশ্চিত করেছেন যে, এই ডোপ টেস্টের রিপোর্টটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক প্রমাণ হিসেবে খুব শীঘ্রই আদালতে জমা দেওয়া হবে।
তবে চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবশরীর থেকে বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের উপস্থিতি মুছে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মাদক সেবনের কয়েক দিন অতিক্রান্ত হলে প্রস্রাবের নমুনায় তার রাসায়নিক উপস্থিতি শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন বা অসম্ভব হয়ে পড়ে। যেহেতু হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৯ দিন পর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, তাই এই সময়ের ব্যবধানে টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক। ঘটনার তাৎক্ষণিক বা কাছাকাছি সময়ে নমুনা সংগ্রহ করা গেলে মাদক সেবনের বিষয়ে আরও শতভাগ নির্ভরযোগ্য ও অকাট্য তথ্য পাওয়া যেত বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে ডোপ টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ আসায় হত্যাকাণ্ডের প্রাক্কালে আসামিদের মাদক সেবনের পুলিশি দাবিকে ঘিরে নতুন করে ধোঁয়াশা ও আইনি যুক্তিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি না মিললেও এই একটিমাত্র প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পুরো হত্যা মামলার তদন্ত থেমে থাকছে না বা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
পুলিশ বলছে, এই মামলার তদন্তে আসামিদের ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত, ফরেনসিক ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট আলামত, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অন্যান্য তথ্য-উপাত্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খুনের প্রকৃত পেছনের কারণ উদঘাটন এবং এই লোমহর্ষক ঘটনার সাথে অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের একাধিক টিম নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আলোচিত এই চার খুন মামলার চার্জশিট চূড়ান্ত করার আগে সবকটি দিক চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি







