বাংলাদেশি পেসারদের তাণ্ডবে ১৯৮ রানে অলআউট অস্ট্রেলিয়া
ছবি: সংগৃহীত
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজের শুরুতেই ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিল বাংলাদেশের পেস আক্রমণ। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টের প্রথম দিন স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করে দিয়েছে বাংলাদেশ। পেসার হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ। ১৭ ওভার বল করে ৩ মেডেনসহ ৫৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নিয়েছেন হাসান। টেস্ট ক্যারিয়ারে তৃতীয়বার ইনিংসে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট নেওয়া এই পেসারের এটাই সেরা বোলিং। তার সঙ্গে এবাদত হোসেন ও তাসকিন আহমেদ দুটি করে উইকেট নেওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস ২০০ রানের আগেই থেমে যায়। ১৯৮ রান টেস্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার সর্বনিম্ন দলীয় সংগ্রহও।
টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। ডারউইনের পেস ও বাউন্স সহায়ক উইকেটে নতুন বল হাতে বাংলাদেশের পেসাররা শুরু থেকেই চেপে ধরেন স্বাগতিক ব্যাটারদের। ইনিংসের শুরুতে জেক ওয়েদারাল্ড ও ট্রাভিস হেড মিলে ৪৫ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়লেও সেটি বড় হতে দেননি হাসান মাহমুদ। দলীয় ৪৫ রানে ফুলার লেন্থের বলে ব্যাটের কানায় লাগিয়ে উইকেটকিপার লিটন দাসের ক্যাচে পরিণত হন ওয়েদারাল্ড। ৩৭ বলে ২৩ রান করে ফেরেন তিনি। নিজের পরের ওভারেই আবার আঘাত হানেন হাসান। গুড লেন্থ থেকে ভেতরে ঢুকে আসা বলে হেডের ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে বল স্টাম্পে আঘাত করলে ২২ রানে বিদায় নেন অস্ট্রেলিয়ার আরেক ওপেনার। ফলে ৪৫ রানের জুটি ভাঙার পর ৫২ রানেই দুই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে স্বাগতিকরা।
এরপর স্টিভেন স্মিথকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়ার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু হয়। এবাদত হোসেনের বলে স্লিপে স্মিথের একটি ক্যাচ তানজিদ হাসান তামিমের হাতে জমা না পড়ায় বাংলাদেশ একটি বড় সুযোগ হারায়। তবে সেই ভুলের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে দেননি বাংলাদেশের বোলাররা। এবাদতের নিজের পরের আঘাতে মার্নাস লাবুশেন মাত্র ১ রান করে সাজঘরে ফেরেন। অফ স্টাম্পের সামান্য বাইরে গুড লেন্থে করা বলে জায়গায় দাঁড়িয়ে খেলতে গিয়ে বাইরের কানায় বল তুলে দেন লাবুশেন; দ্বিতীয় স্লিপে থাকা নাজমুল হোসেন শান্ত সেটি নিরাপদে তালুবন্দি করেন। ২০ বল খেলে মাত্র ১ রান করেই থামেন অস্ট্রেলিয়ার এই অভিজ্ঞ ব্যাটার। এরপর আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করেন ক্যামেরন গ্রিন। তাসকিন আহমেদের ওভারের শুরুতে ছক্কা হাঁকালেও একই ওভারের শেষ বলে অনসাইডে খেলতে গিয়ে শর্ট মিডউইকেটে মুশফিকুর রহিমের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। ১৩ বলে ১৩ রান করে ফেরেন গ্রিন। ফলে লাঞ্চের সময় অস্ট্রেলিয়ার স্কোর দাঁড়ায় ৪ উইকেটে ৭৪ রান।
লাঞ্চের পর অবশ্য কিছুটা স্বস্তিতে ব্যাট করার সুযোগ পান স্টিভেন স্মিথ ও অ্যালেক্স ক্যারি। বাংলাদেশি পেসারদের সামলিয়ে দ্রুত রান তুলতে থাকেন দুজন। পঞ্চম উইকেটে ৮৫ বলে ৫৫ রানের জুটি গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের আভাস দেন তারা। কিন্তু ভয়ংকর হয়ে ওঠার আগেই সেই জুটি ভেঙে দেন এবাদত হোসেন। ৩৭তম ওভারের প্রথম বলে অফ স্টাম্পের বাইরে পড়ে ভেতরে ঢুকে আসা ডেলিভারিতে পাঞ্চ করতে গিয়ে ব্যাটের ভেতরের কানায় বল লাগিয়ে স্টাম্পে আঘাত করেন ক্যারি। ১৯ রান করে তার বিদায়ে ভাঙে ৫৫ রানের জুটি।
আরও পড়ুন: ডারউইনে বাংলাদেশের দাপটে কাঁপছে অস্ট্রেলিয়া
ক্যারির বিদায়ের পর উইকেটে আসা বিউ ওয়েবস্টারকেও বেশিক্ষণ টিকতে দেননি তাসকিন আহমেদ। গুড লেন্থে পিচ করে অফ স্টাম্পে ঢুকে যাওয়া দুর্দান্ত এক ইনসুইংয়ে ওয়েবস্টারের স্টাম্প উড়িয়ে দেন বাংলাদেশের এই পেসার। ১০ বলে ১২ রান করে ফেরেন ওয়েবস্টার। এরপর অস্ট্রেলিয়ার লোয়ার অর্ডারেও দ্রুত আঘাত হানে বাংলাদেশ। অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে কট বিহাইন্ড করেন হাসান মাহমুদ; মাত্র ৯ রান করে ফেরেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক। একইভাবে মিচেল স্টার্কও হাসানের বলে উইকেটরক্ষক লিটন দাসের গ্লাভসে ক্যাচ দিয়ে ১ রানে বিদায় নেন। ফলে চা বিরতির আগেই ১৮৩ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে কার্যত ইনিংস হারানোর শঙ্কায় পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।
এক প্রান্তে অবশ্য অবিচল ছিলেন স্টিভেন স্মিথ। দ্রুত উইকেট হারানোর মাঝেও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে ৭৬ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ১০৯ বলে ৭১ রান করে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন অভিজ্ঞ এই ব্যাটার। তার ইনিংসে ছিল সাতটি চার ও একটি ছক্কা। কিন্তু দলকে বড় সংগ্রহ এনে দেওয়ার জন্য অন্য প্রান্তে পর্যাপ্ত সমর্থন পাননি স্মিথ। চা বিরতির পর বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল মূলত স্মিথকে ফিরিয়ে দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার লেজ দ্রুত মুড়িয়ে ফেলা আর সেই কাজটিই করেন হাসান মাহমুদ। খাটো লেন্থের বলে এগিয়ে এসে পুল করতে গিয়ে টপ এজ করেন স্মিথ। বল আকাশে উঠে গেলে উইকেটের পেছনে লিটন দাস সহজ ক্যাচ নেন। ৭১ রানে স্মিথের বিদায়ের সঙ্গে ইনিংসে পাঁচ উইকেট পূর্ণ হয় হাসানের। এরপর নাথান লায়নকে ৭ রানে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের সমাপ্তি টানেন তিনিই।
ফলে ৫৩ ওভারে ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। হাসান মাহমুদ ৬টি, এবাদত হোসেন ও তাসকিন আহমেদ দুটি করে উইকেট নেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার আগের সর্বনিম্ন টেস্ট ইনিংসের রেকর্ডও এদিন ভেঙে যায়। হাসানের ৬ উইকেটের পারফরম্যান্সটি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের কোনো বোলারের সেরা বোলিং হিসেবেও উঠে এসেছে; এর আগে এই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ইনিংস বোলিং ছিল মোহাম্মদ রফিকের ৫ উইকেট।
অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে প্রথম দিন শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশের দুই ওপেনার শাদমান ইসলাম ও তানজিদ হাসান উইকেটে থেকে ৪ ও ২ রানে অপরাজিত থাকেন। দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪.১ ওভারে ১২ রান, অর্থাৎ স্বাগতিকদের চেয়ে ১৮৬ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় দিন শুরু করবে বাংলাদেশ।
ডারউইনের এই পারফরম্যান্সের তাৎপর্য বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি। ২০০৩ সালের পর এই প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ। দুই দলের সর্বশেষ টেস্ট সিরিজ হয়েছিল ২০০৩ সালে, আর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের সর্বশেষ টেস্টও ছিল সেই সফরেই। চলতি সিরিজটি একই সঙ্গে ২০২৫-২৭ আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ। প্রথম টেস্ট ১৩ থেকে ১৭ আগস্ট ডারউইনে এবং দ্বিতীয় টেস্ট ২২ থেকে ২৬ আগস্ট ম্যাকেতে হওয়ার কথা।
সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পেস আক্রমণের ভারসাম্য। চোটের কারণে নাহিদ রানা ও তানজিম হাসান সাকিবকে পাওয়া যায়নি; এ ছাড়া সফরের আগে এবাদত হোসেনের অংশগ্রহণ নিয়েও অনিশ্চয়তা ছিল। শেষ পর্যন্ত তাসকিন, হাসান, এবাদত ও খালেদ আহমেদের ওপর নির্ভর করেই পেস আক্রমণ সাজায় বাংলাদেশ। সেই আক্রমণের নেতৃত্বই প্রথম দিনে কার্যত নিজের কাঁধে তুলে নেন হাসান মাহমুদ।
হাসানের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পেছনে সাম্প্রতিক কাউন্টি ক্রিকেটের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইংল্যান্ডের কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে কেন্টের হয়ে অভিষেকেই তিনি ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়েছিলেন, যার মধ্যে দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট ছিল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইনে এসে সেই ছন্দই যেন আরও পরিণত রূপ পেল।
প্রথম দিনের সবচেয়ে বড় বার্তাটি তাই শুধু অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে অলআউট করা নয়; বরং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের পেসারদের এমন নিয়ন্ত্রিত, আক্রমণাত্মক ও ধারাবাহিক বোলিং। নতুন বলে হাসানের দুই ওপেনার শিকার, মাঝের সেশনে এবাদত-তাসকিনের গুরুত্বপূর্ণ আঘাত এবং শেষ বিকেলে আবার হাসানের হাতে ইনিংসের শেষ দুই উইকেট পুরো দিনজুড়েই বাংলাদেশের বোলিং ছিল অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টির গল্প। এখন সেই চাপকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে রূপ দিতে হলে দ্বিতীয় দিনে ব্যাট হাতে বাংলাদেশকে দেখাতে হবে একই রকম দৃঢ়তা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








