আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:২২, ১৩ আগস্ট ২০২৬

মার্কিন রণতরীতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ৭ নৌসদস্য নিহত

মার্কিন রণতরীতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ৭ নৌসদস্য নিহত

ছবি: সংগৃহীত

ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে বড় ধরনের সংকটের খবর পাওয়া গেছে। 

ইরানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি এবং মেহর নিউজ এজেন্সির (এমএনএ) বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, রণতরীটির ভেতরে ক্রুদের মধ্যকার তীব্র অসন্তোষ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত সাতজন মার্কিন নৌসেনা নিহত এবং আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী বা পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই প্রাণহানির খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

ইরানি সংবাদমাধ্যমের সামরিক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে একটানা মোতায়েন থাকার ফলে রণতরীটির প্রায় পাঁচ হাজার ক্রু ও মেরিন সদস্যের মধ্যে চরম মানসিক চাপ এবং অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠে। আধুনিক সামরিক ইতিহাসে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর এটি অন্যতম দীর্ঘ একটানা সমুদ্র মোতায়েন। 

জানা গেছে, যুদ্ধজাহাজটি টানা ২৬৩ দিন ধরে মোতায়েন রয়েছে এবং যার মধ্যে প্রায় ২০৮ দিনই তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে সমুদ্রে কাটিয়েছেন (যদিও জুলাই মাসে ওমানে স্বল্প সময়ের একটি বিরতি নেওয়া হয়েছিল)।

দীর্ঘ এই মোতায়েন এবং অনিশ্চিত প্রত্যাবর্তনসূচির কারণে ক্রুদের জীবনযাত্রা ও কর্মপরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। খাবার সংকট হিসেবে প্রতিটি সদস্যের জন্য বরাদ্দ খাবার কমিয়ে নামমাত্র পরিমাণে নিয়ে আসা হয়েছিল। এছাড়া গত দুই সপ্তাহ ধরে জাহাজের প্রধান লন্ড্রি সুবিধাগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা এবং গোসলের স্থানগুলোতে (শাওয়ার এরিয়া) অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ছত্রাকের উপদ্রব দেখা দেওয়ায় নাবিকদের মধ্যে গুরুতর চর্মরোগ ও ফাঙ্গাল ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়েছিল।

আরও পড়ুন: ২৩ বছর পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনা

পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং ক্রুদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ প্রশমিত করার লক্ষ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের একজন বিশেষ উপদেষ্টা সরাসরি রণতরীটিতে গিয়ে উপস্থিত হন। সেখানে ক্রুদের নিয়ে আয়োজিত একটি সমাবেশে ওই উপদেষ্টা বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উপস্থিত ক্ষুব্ধ নৌসেনারা তাকে লক্ষ্য করে তীব্র দুয়োধ্বনি দেন এবং তার দিকে পানির বোতল ছুড়ে মারেন।

এই হট্টগোল ও প্রতিবাদের জেরে দ্রুতই ক্রুদের নিজেদের দুটি পক্ষের মধ্যে চরম বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি শুরু হয়, যা পরবর্তীতে মারাত্মক সহিংস রূপ নেয়। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, সংঘর্ষের সময় নৌসদস্যরা একে অপরের ওপর ছুরি এবং অন্যান্য ধারালো অস্ত্র নিয়ে চড়াও হন। এই ধারালো অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ফলেই ঘটনাস্থলে সাতজন মার্কিন নৌসেনা নিহত এবং আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। এই প্রাণঘাতী ঘটনার পর পুরো রণতরীজুড়ে চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রণতরীটির এই দীর্ঘমেয়াদি ও কষ্টদায়ক মোতায়েন নিয়ে শুধু জাহাজের ভেতরেই নয়, বাইরেও ক্রুদের পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়েগোতে প্রায় দুইশ নৌসেনার পরিবারের সদস্য ভারপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনী সচিব হাং কাওয়ের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। তারা সেখানে নির্দিষ্ট কোনো প্রত্যাবর্তনের তারিখ না থাকা, চরম মানসিক অবসাদ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ ও প্রতিবাদ জানান। এছাড়া যুদ্ধজাহাজটিতে কর্মরত বেশ কিছু নাবিক মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহত্যা বা সমুদ্রের পানিতে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও বিভিন্ন সামরিক পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের গোড়ার দিকেও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু নিরাপত্তা ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছিল। গত ফেব্রুয়ারি মাসে আরব সাগরের ওপরে রণতরীটির দিকে ধেয়ে আসা একটি ইরানি ড্রোনকে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মার্চ মাসে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) রণতরীটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করলেও মার্কিন পেন্টাগন কর্তৃপক্ষ সেই সময় তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। এছাড়া চলতি বছরের মার্চ মাসেই রণতরীতে এক নাবিকের আহত হওয়ার তথ্য মার্কিন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করলেও তা যুদ্ধ-সম্পর্কিত নয় বলে দাবি করা হয়েছিল।

বর্তমানে রণতরীটি ভারত মহাসাগর ও তৎসংলগ্ন আরব সাগরীয় অঞ্চলে অবস্থান করছে এবং ইরানের ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর করার মিশনে যুক্ত রয়েছে বলে সংবাদে প্রকাশ। তবে সাতজন মার্কিন সেনার মৃত্যুর বিষয়ে ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর এই দাবিকে এখনো পর্যন্ত কোনো স্বাধীন সূত্র বা মার্কিন নৌবাহিনী নিশ্চিত করেনি। ওয়াশিংটন বা সেন্টকমের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না আসায় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই এটিকে ভূরাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বা অতিরঞ্জিত দাবি হিসেবে দেখছেন। তা সত্ত্বেও, দীর্ঘমেয়াদি এই সামরিক অভিযানে মার্কিন নৌবাহিনীর ভেতরে যে তীব্র মানসিক চাপ, অব্যবস্থাপনা এবং সদস্যেদের মনোবল হ্রাসের বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে, তা এই রিপোর্টের মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়