‘অবৈধ অটোরিকশার দৌরাত্ম্যে মধ্যরাতেও বিদ্যুতের চাহিদা’
ছবি: সংগৃহীত
দেশে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রচলিত ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে উল্লেখ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন যে, অবৈধভাবে পরিচালিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং ই-বাইকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে হঠাৎ করেই বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে গভীর রাতে বিদ্যুতের যে চাহিদা তৈরি হচ্ছে, তা অতীতে কখনো দেখা যায়নি।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা: জরুরি অগ্রাধিকারসমূহ এবং একটি টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এবং পরবর্তীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, এতদিন সাধারণত সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সময়কে পিক আওয়ার বা সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ব্যবহারের সময় হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং এরপর চাহিদা ক্রমান্বয়ে কমে আসত। কিন্তু বর্তমানে রাত ১২টার পরও জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের অস্বাভাবিক চাহিদা বজায় থাকছে। এই পরিবর্তনের মূল কারণ হিসেবে তিনি বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ই-বাইককে দায়ী করেছেন, যা এককথায় গরিবের টেসলা হিসেবে পরিচিত। সারাদিন চলাচলের পর এই বিশাল সংখ্যক যানবাহন রাতে একসাথে চার্জ দেওয়ার ফলে জাতীয় গ্রিডের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
মন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন যে, রাতের বেলায় এসব বাহনে যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়, তার সিংহভাগ সংযোগই অবৈধ বা অননুমোদিত। বিদ্যুৎ বিভাগ এসব অবৈধ সংযোগ চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার জোরালো অভিযান পরিচালনা করছে। তবে অনেক এলাকায় অবৈধ সংযোগ কাটতে গেলে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বাধার মুখে পড়ছেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে হামলার শিকার হচ্ছেন।
বর্তমান জ্বালানি খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে সিপিডির মূল প্রাবন্ধিক ফখরুদ্দিন আল কবীরের উপস্থাপনায় জানানো হয় যে, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১২০০ থেকে ১৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন হ্রাস পাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে পর্যাপ্ত এলএনজি আমদানি করা সম্ভব না হওয়ায় এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
এই সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার পেছনে মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত আগুন লাগার ঘটনাকে দায়ী করেন মন্ত্রী। তবে সময়মতো পাশে থাকা অন্য এলএনজিবাহী জাহাজ সরিয়ে নেওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে একটি এফএসআরইউ সচল রেখে ন্যূনতম গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে ত্রুটিপূর্ণ টার্মিনালের মেরামত শেষে দুটি বয়লারের কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য টানা ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন সম্পূর্ণ সিস্টেম শাটডাউন বা বন্ধ রাখতে হবে, যা সাময়িক সংকট আরও কিছুটা বাড়িয়ে তুলতে পারে। এছাড়া শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ভোলা থেকে কনটেইনার ট্রাকে করে গ্যাস সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।
আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ বিপর্যয়, দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং
বিগত সরকারের তীব্র সমালোচনা করে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, বিগত ১৭ বছর ধরে জ্বালানি খাতে কোনো সঠিক অনুসন্ধান বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না করে কেবল আমদানির ওপর নির্ভরতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল। দুটি এফএসআরইউয়ের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ভিত্তি তৈরি না করায় আজ দেশের জ্বালানি খাত নাজুক অবস্থায় পড়েছে।
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছে বলে জানান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
নতুন এফএসআরইউ অর্ডার: দেশের গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে ইতোমধ্যে ১০-১২ দিন আগে নতুন একটি এলএনজি টার্মিনালের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অর্ডার দেওয়া হয়েছে।
২০২৯ সালের লক্ষ্যমাত্রা: ২০২৯ সালের মধ্যে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পায়রা, মোংলা এবং হিরণ পয়েন্ট বা খুলনা এলাকায় আরও তিনটি নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সারা দেশে সুষম ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিদেশি বিনিয়োগ: আমেরিকার বড় একটি বিনিয়োগকারী দল এলএনজি ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং তাদের দ্রুত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান: বাপেক্সকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করতে নতুন দুটি রিগ কেনার আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত নতুন কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে।
তেল আমদানি সংক্রান্ত বিভিন্ন সমালোচনার জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, বসুন্ধরা গ্রুপকে তেল আমদানি দেওয়ার বিষয়ে যেসব কথা বলা হচ্ছে, মূলত এ বিষয়ে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল নিয়ে বাজারে নানা ধরনের মিথ্যা গুজব ছড়ানো হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি দেশবাসীকে এসব গুজবে কান না দেওয়ার জন্য জোরালো আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকার শিল্প খাত ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে এবং চলমান পরিস্থিতি উত্তরণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় উক্ত আলোচনা সভায় অন্যান্যদের মধ্যে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন, বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাতসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








