আগামী সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফর
ছবি: নিউজবাংলাদেশ (এআই)
আগামী সপ্তাহের শেষ ভাগে বা আগস্টের শেষ সপ্তাহে (সম্ভাব্য তারিখ ২২-২৩ আগস্ট) ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে দ্বিপক্ষীয় সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি হবে সরকারপ্রধান হিসেবে তার প্রথম বিদেশ সফর।
ভারতীয় প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-সহ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সূত্রের বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিগত কিছুদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন কাটিয়ে এই সফরকে দুদেশের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো তারিখ ঘোষণা করা না হলেও, ঢাকা ও নয়াদিল্লি উভয় রাজধানীতেই এই সফরকে কেন্দ্র করে উচ্চপর্যায়ের প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক লবিং জোরদার করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, সফরটি চূড়ান্তকরণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ২৭ বা ২৮ আগস্ট জাতিসংঘ বিষয়ক কার্যক্রমে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের; তার আগেই প্রধানমন্ত্রীর এই দুই দিনের দ্বিপক্ষীয় সফরটি সম্পন্ন হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রথম মুখোমুখি বৈঠক ও কৌশলগত সমীকরণ
সফরের মূল আকর্ষণ হতে যাচ্ছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য প্রথম আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এটিই হতে যাচ্ছে দুই শীর্ষ নেতার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। এই বৈঠকে বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলোচনায় আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে যে স্থবিরতা ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বের হয়ে আসার একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করতে পারে এই শীর্ষ বৈঠক।
গত এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফর করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরবর্তীতে গত ১০ আগস্ট ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সেই বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হলেও একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিল ঢাকা।
আরও পড়ুন: সকল দেশ সফরের ক্ষেত্রেই সরকার পজিটিভ আছে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও রাজনৈতিক বিতর্ক: প্রধান সংবেদনশীল ইস্যু
এই সফরে দুই দেশের আলোচনায় সবচেয়ে সংবেদনশীল ও জটিল ইস্যু হিসেবে থাকছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই তিনি সেখানে অবস্থান করছেন।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে হস্তান্তরের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিষয়টি যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে চলতি মাসের শুরুতে দিল্লিতে একটি বেসরকারি সংগঠনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক মন্তব্য ও বক্তব্য প্রদানকে কেন্দ্র করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। দণ্ডিত ও পলাতক কোনো আসামিকে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ঢাকা। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত রাখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। ফলে নয়াদিল্লির বৈঠকে এই বিরোধপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইস্যুটি কীভাবে সুরাহা হয়, সেদিকেই নজর থাকবে দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
অভিন্ন নদী পানিবণ্টন, বাণিজ্য ও সীমান্ত নিরাপত্তা
শেখ হাসিনা প্রত্যর্পণ ইস্যুর পাশাপাশি দুই দেশের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বাস্তব সমস্যাগুলোও আলোচনার টেবিলে সমানভাবে গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়ায় চুক্তি নবায়ন বা নতুন রূপরেখা তৈরির বিষয়টি এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সময় ঘনিয়ে আসায় এই চুক্তি নবায়নের আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি চায় ঢাকা।
এছাড়াও, দুই দেশের মধ্যকার বিশাল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত হত্যা রোধ, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং ট্রানজিট ও জ্বালানি খাতের অংশীদারিত্ব বাড়াতে ফলপ্রসূ আলোচনার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশের স্থিতিশীল ও বন্ধুভাবাপন্ন অবস্থান নয়াদিল্লির জন্যও অত্যন্ত কৌশলগত ও অপরিহার্য।
ব্রিকস আমন্ত্রণ এবং সম্পর্কের নতুন সমীকরণ
আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস আউটরিচ সেশনে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই সম্মেলনে যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসলেও, বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দ্বিপক্ষীয় সফরটিই এই মুহূর্তে সরকারের মূল অগ্রাধিকার।
সব মিলিয়ে, কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে যে এই একটিমাত্র সফরেই সমস্ত জটিল সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান আশা করা অবাস্তব। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই নয়াদিল্লি সফর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক সংলাপের বরফ গলাতে এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থার ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সেতু হিসেবে কাজ করবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








