সীতাকুণ্ডে গ্যাস ট্র্যাজেডি, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নির্দেশ
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়িয়েছে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট ২০২৬) সকালে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ (ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড) নামক প্রতিষ্ঠানে এই দুর্ঘটনা ঘটে। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজের সময় পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় এ বিপর্যয় ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে বিকেলের দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে গিয়ে নিহত ও আহত শ্রমিকদের খোঁজখবর নেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। সরকার নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করছে এবং তদন্তে যা বেরিয়ে আসবে, তার ভিত্তিতেই দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে কারও পক্ষে বা বিপক্ষে দেখার সুযোগ নেই, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো সঠিক তথ্য উদ্ঘাটন করা।
স্থানীয় সূত্র, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সকালে ওই ইয়ার্ডে একটি স্ক্র্যাপ এলএনজি (LNG) জাহাজে হাউসকিপিং ও কাটার কাজ চলার সময় হঠাৎ একটি ট্যাংক থেকে মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। গ্যাস নির্গমনের বিষয়টি দেখতে গেলে বা এর সংস্পর্শে আসলে শ্রমিক ও সেফটি টিমের সদস্যরা একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় কয়েকজনকে দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আট শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে সাতজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন— সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭), হাবিবুর রহমান (৫০), দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮), গাইবান্ধার মো. খোকন (৪০) এবং মো. রানা (২৭)। এছাড়া গুরুতর আহত অবস্থায় আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। জাহাজের ভেতরে উচ্চমাত্রার গ্যাস জমে থাকায় এবং পরবর্তীতে জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় উদ্ধার কাজ ও তল্লাশি চালাতে ফায়ার সার্ভিসকে বেশ বেগ পেতে হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তা করতে ঘটনাস্থলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ টিম ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা কাজ শুরু করেছেন।
আরও পড়ুন: ভাটিয়ারীতে জাহাজভাঙা কারখানায় গ্যাস বিস্ফোরণে নিহত বেড়ে ৮
চমেক হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ঘোষণা দিয়েছেন যে, নিহত প্রতিটি শ্রমিকের পরিবারকে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। এছাড়া সরকারিভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কারখানার কমপ্লায়েন্স বা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড যথাযথভাবে পালিত হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে।
শিপইয়ার্ডের এই দুর্ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রভাব ও সমালোচনা প্রসঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের স্পষ্ট করেন যে, গ্রিন ইয়ার্ডের গ্রেডিং বা সনদ সরকার প্রদান করে না। এটি আন্তর্জাতিক হংকং কনভেনশনের নির্ধারিত নীতিমালা ও চার্টার অনুযায়ী দেওয়া হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ওই নীতিমালা ও কমপ্লায়েন্সগুলো সঠিকভাবে পূরণ করলেই কেবল এই সনদ অর্জন করে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দেশীয় শিল্পকারখানায় বিশেষ করে শিপব্রেকিং খাতে আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স এবং কঠোর শ্রমিক নিরাপত্তার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই ইয়ার্ডের ক্ষেত্রেও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় বা নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল কি না, তা তদন্ত রিপোর্টের পর স্পষ্ট হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ছুটির দিনে পর্যাপ্ত সেফটি প্রটোকল না মেনে এভাবে জাহাজ কাটার পেছনে কার্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা নিয়ে শ্রমিক সংগঠন ও স্থানীয় মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








