মেসিকে বোমা হামলার হুমকি, ঝুঁকিতে রোনালদোও
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ মানেই গ্যালারিভরা দর্শক, কোটি মানুষের উন্মাদনা, তারকাদের পায়ের জাদু আর একেকটি গোল ঘিরে তুমুল উদযাপন। কিন্তু ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো আয়োজিত বিশ্বকাপের পর্দা নামার কয়েক সপ্তাহ পর সামনে আসা কিছু তথ্য সেই উৎসবের আড়ালে থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার ছবি তুলে ধরেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর একটি ফাঁস হওয়া নিরাপত্তা নথি এবং সেটিকে উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, টুর্নামেন্ট চলাকালে লিওনেল মেসিকে লক্ষ্য করে একাধিক প্রাণনাশের হুমকি এসেছিল; ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে ঘিরেও নজরে এসেছিল সন্দেহজনক তৎপরতা। শুধু দুই মহাতারকাই নন, ম্যাচ রেফারি, ভিএআর কর্মকর্তা, বিভিন্ন দলের খেলোয়াড়, কোচ ও কর্মকর্তারাও হুমকি ও অনলাইন হয়রানির শিকার হন। তবে এসব তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমারেখা হলো ফাঁস হওয়া নথিতে যেসব হুমকি বা পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর সবকটিই বাস্তব হামলার প্রস্তুতি ছিল এমনটা প্রমাণিত হয়নি; বরং নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে সেগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছিল।
ফাঁস হওয়া নথিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়ক মেসিকে ঘিরে একাধিক হুমকি। আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ ছিল জর্ডানের বিপক্ষে, ২৭ জুন ডালাসে। ম্যাচটির আগে একটি ফোনকল নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম সতর্ক অবস্থায় নিয়ে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি ডালাস বিমানবন্দরে ফোন করে দাবি করেন, তিনি আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করবেন। হুমকির বর্ণনায় এআর-১৫ ধরনের রাইফেল এবং গ্রেনেডের কথা উঠে আসে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল, হুমকিদাতা মেসিকে সরাসরি লক্ষ্য করার কথা বলেছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত ওই হুমকি বাস্তব হামলায় রূপ নেয়নি, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কাছে বিষয়টি ছিল সম্ভাব্য সশস্ত্র হামলার একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। ফিফার সূচি অনুযায়ী ম্যাচটি ডালাসেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং আর্জেন্টিনা ৩-১ গোলে জর্ডানকে হারায়।
মেসিকে ঘিরে দ্বিতীয় বড় সতর্কবার্তাটি আসে আর্জেন্টিনা ও মিসরের শেষ ষোলো ম্যাচকে কেন্দ্র করে। ৭ জুলাই আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ম্যাচটির আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ব্যক্তি দাবি করেন, শরীরে চারটি বোমা বেঁধে স্টেডিয়ামে ঢুকে মেসিকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরণ ঘটানো হবে। হুমকিটি কতটা বাস্তব ছিল, তা নিয়ে পরবর্তী সময়ে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি; কিন্তু সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও ছিল না নিরাপত্তা বাহিনীর। একই ম্যাচের সময় পুলিশকে আরেকটি ফোন করে স্টেডিয়ামের ভেতরে বিস্ফোরক থাকার দাবি করা হয়। খবর পাওয়ার পর ভেন্যুতে জরুরি তল্লাশি চালানো হয়, বিস্ফোরক শনাক্তকারী প্রশিক্ষিত কুকুর ও বিশেষায়িত দল কাজে নামে। তল্লাশিতে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি এবং সতর্কবার্তাটি শেষ পর্যন্ত ভুয়া বলে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু কয়েক মিনিটের একটি মিথ্যা সতর্কবার্তাও যে একটি বিশ্বকাপ ভেন্যুতে কত বড় নিরাপত্তা অভিযান শুরু করে দিতে পারে, ঘটনাটি তারই দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। মজার বিষয় হলো, ওই ম্যাচটি মোটেও একতরফা ছিল না আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে মিসরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে।
মেসিকে ঘিরে পরপর এমন হুমকি আসার পেছনে তাঁর বৈশ্বিক তারকা-পরিচিতিই যে বড় কারণ, নিরাপত্তা বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে সেটি অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বকাপের মতো একটি মেগা-ইভেন্টে একজন তারকার অবস্থান, যাতায়াত, হোটেল, প্রশিক্ষণস্থল কিংবা ম্যাচভেন্যু সম্পর্কে সামান্য তথ্যও সম্ভাব্য হামলাকারী বা উগ্র সমর্থকের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই ফাঁস হওয়া নথিতে শুধু স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা নয়, দলগুলোর হোটেল, যাতায়াতপথ এবং খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। মেসিকে কেন্দ্র করে আসা হুমকিগুলোর পাশাপাশি আর্জেন্টিনা দল, অন্য দলের খেলোয়াড়, ফিফার কর্মকর্তা, রেফারি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: বাবা হারালেন ফুটবল মহাতারকা মেসি
বিশ্বকাপের আরেক মহাতারকা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা উদ্বেগের ঘটনা সামনে এসেছে। ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, ফিফার একজন কর্মী পুলিশকে এমন এক ব্যক্তির ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন, যিনি রোনালদোর থাকার জায়গা ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানার চেষ্টা করছিলেন। সরাসরি হত্যার হুমকি না থাকলেও কোনো তারকার হোটেল বা অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা নিরাপত্তা সংস্থার কাছে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহজনক। এর পর আরও একটি ঘটনায় রোনালদোর ব্যক্তিগত পরিসরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এক ব্যক্তি কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা অতিক্রম করে রোনালদোর হোটেলের কাছাকাছি পৌঁছে তার সঙ্গে একই লিফটে ওঠার চেষ্টা করেন।
তাকে আটকের পর তিনি দাবি করেন, উদ্দেশ্য ছিল কেবল রোনালদোর সঙ্গে একটি সেলফি তোলা। ঘটনাটি নিছক উচ্ছ্বসিত সমর্থকের বেপরোয়া আচরণ ছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল সেটি নিয়ে নিরাপত্তা সংস্থার সতর্কতাই ছিল মুখ্য।
তারকাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি ম্যাচ পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের ঘিরেও বিশ্বকাপে তৈরি হয়েছিল ভয়াবহ অনলাইন চাপ। আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের দায়িত্বে থাকা ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
ফাঁস হওয়া নিরাপত্তা নথির বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপে ছয় হাজারের বেশি হুমকিমূলক ও ঘৃণামূলক বার্তা পাঠানো হয়েছিল। একই ম্যাচের ভিএআর কর্মকর্তা উইলি দেলাজোও হুমকির শিকার হন। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে ফ্রান্সে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বকাপের একটি সিদ্ধান্ত মাঠে শেষ হয়ে গেলেও ডিজিটাল দুনিয়ায় তার প্রতিক্রিয়া একজন রেফারির ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছিল।
এই প্রবণতার সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণগুলোর একটি দেখা যায় কলম্বিয়ার জ্যামিন্তন কামপাজের ক্ষেত্রে। ৭ জুলাই ভ্যাঙ্কুভারে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ষোলো ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি গোলের সুযোগ নষ্ট করেন তিনি। পরে টাইব্রেকারে কলম্বিয়া ৪-৩ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। ম্যাচের পর কামপাজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক মন্তব্যের পাশাপাশি মৃত্যুর হুমকি ছড়িয়ে পড়ে। হুমকির আওতায় আসে তার পরিবারও। কলম্বিয়ান ফুটবল ফেডারেশন প্রকাশ্যে এসব হুমকির নিন্দা জানিয়ে তদন্তের জন্য দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের প্রতি আহ্বান জানায়। নিরাপত্তার কারণে কামপাজ সতীর্থদের সঙ্গে দেশে ফেরার ফ্লাইটেও ওঠেননি বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কলম্বিয়ার ফুটবলে ১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর আন্দ্রেস এসকোবার হত্যার ভয়াবহ স্মৃতি এখনো জীবন্ত।
নরওয়ের আলেক্সান্ডার সরলথও বিশ্বকাপের শেষদিকে একই ধরনের সাইবার-হয়রানির শিকার হন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে যখন এগিয়ে ছিল, তখন একটি পাল্টা আক্রমণে সরলথের সামনে গোলের সুযোগ তৈরি হয়; পাশে অপেক্ষায় ছিলেন আর্লিং হলান্ড। সরলথ নিজেই শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যা শেষ পর্যন্ত গোল হয়নি। নরওয়ে অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরলথ ও তার সঙ্গী লেনা সেলনেসের অ্যাকাউন্টে ব্যাপক আক্রমণ শুরু হয়। সেলনেস প্রকাশ্যে কিছু হুমকির স্ক্রিনশট তুলে ধরেন; সেখানে সরলথকে আত্মহত্যা করতে বলা থেকে শুরু করে হত্যার হুমকিও ছিল। নরওয়ের কোচ স্টালে সলবাকেনও এই আচরণকে তীব্রভাবে নিন্দা করেন। অর্থাৎ একটি ম্যাচের একটি সিদ্ধান্ত কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে, সরলথের ঘটনা তার সাম্প্রতিক উদাহরণ।
বিশ্বকাপে নিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু অনলাইন হুমকি কিংবা ব্যক্তিগত হামলার আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ ছিল না; ভেন্যুগুলোর নিরাপত্তা কাঠামোকেও একাধিকবার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছে। ইংল্যান্ড দলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে টুর্নামেন্টের অন্যতম কঠোর ব্যবস্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দলটির অবস্থানস্থল ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে ঘিরে একাধিক নিরাপত্তা স্তর, কংক্রিট ব্যারিয়ার, অ্যান্টি-স্নাইপার ব্যবস্থা এবং ড্রোন-ঝুঁকি মোকাবিলায় নো-ফ্লাই জোনের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তারপরও মিডিয়া সেন্টারে এক ব্যক্তির অনুপ্রবেশ এবং হাতে রেঞ্চ নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ঘটনা নিরাপত্তা পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। বিপুলসংখ্যক দর্শক, সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবক, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা একই পরিসরে চলাচল করায় বিশ্বকাপের মতো আয়োজনের নিরাপত্তা যে কেবল স্টেডিয়ামের গেট বা গ্যালারির প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ঘটনাগুলো সেটিও স্পষ্ট করে।
নিরাপত্তা-উদ্বেগের আরেকটি দিক ছিল ফুটবল-সম্পর্কিত অনলাইন ঘৃণা, বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা। ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে প্যারাগুয়েতে যে বিতর্ক তৈরি হয়, সেটি শেষ পর্যন্ত মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ও বর্ণবাদী বক্তব্যের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফরাসি তারকাকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক বক্তব্যের পাশাপাশি তার প্রতিকৃতি বা কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর ঘটনাও সামনে আসে। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল নিয়েও মাঠের ফলাফল ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। দেশটির জাতীয় দলের কোচ হং মিয়ং-বোর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে আগে থেকেই তদন্ত চলছিল; বিশ্বকাপে দলের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর সেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ৬ আগস্ট কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সদর দপ্তরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে নিয়োগপ্রক্রিয়া-সংক্রান্ত নথি জব্দ করে। তবে এ তদন্তের সঙ্গে সরাসরি সন্ত্রাসী হুমকির ঘটনা এক করে দেখা ঠিক হবে না; এটি মূলত ফুটবল প্রশাসন ও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে চলমান তদন্ত।
সবকিছুর পেছনে ফিরে তাকালে ২০২৬ বিশ্বকাপের নিরাপত্তা-চিত্রের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো হুমকির প্রকৃতির বৈচিত্র্য। কোথাও ছিল সম্ভাব্য সশস্ত্র হামলার ফোনকল, কোথাও আত্মঘাতী বোমা হামলার দাবি, কোথাও স্টেডিয়ামে বিস্ফোরক থাকার ভুয়া সতর্কবার্তা, আবার কোথাও তারকার হোটেলে পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা। এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে একটি ভুল পাস, একটি মিস, একটি রেফারিং সিদ্ধান্ত কিংবা একটি ম্যাচ হারের পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ কোনো খেলোয়াড় বা কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে ঘৃণা ও হুমকি ছড়িয়ে দিতে পারে। কামপাজ ও সরলথের ঘটনা দেখিয়েছে, ডিজিটাল হুমকি কখনো কখনো খেলোয়াড়ের বাস্তব জীবনের নিরাপত্তা-সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করতে পারে।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে অন্ধকার প্রতীক হয়ে ফিরে আসে ১৯৯৪ সালের আন্দ্রেস এসকোবারের স্মৃতি। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোলের পর দেশে ফিরে হত্যার শিকার হয়েছিলেন কলম্বিয়ার এই ডিফেন্ডার। ২০২৬ বিশ্বকাপে কামপাজের বিরুদ্ধে মৃত্যুর হুমকি এবং সরলথের পরিবার পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া অনলাইন আক্রমণ সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটায়নি এটি স্পষ্ট করে বলা জরুরি কিন্তু ফুটবলের আবেগ যখন ঘৃণা ও সহিংসতার সীমা অতিক্রম করে, তখন কী ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, সেই পুরোনো সতর্কবার্তাকে নতুন করে সামনে এনেছে। কামপাজের ঘটনায় কলম্বিয়ান ফুটবল ফেডারেশনও সরাসরি বলেছে, কোনো খেলোয়াড় বা তার পরিবারের সদস্যকে দেশের হয়ে খেলার কারণে ভয় দেখানো বা হুমকি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত মাঠে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়নি এটিই ছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। কিন্তু ফাঁস হওয়া নথিতে উঠে আসা ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, বিপদ ঠেকানো মানেই বিপদ ছিল না এমন নয়। বরং সম্ভাব্য হুমকির প্রতিটি বার্তাকে যাচাই করা, সন্দেহজনক ব্যক্তির গতিবিধি নজরে রাখা, স্টেডিয়াম তল্লাশি করা, তারকার হোটেল সুরক্ষিত রাখা, অনলাইন হুমকি শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন হলে পরিবার পর্যন্ত নিরাপত্তার আওতায় আনা বিশ্বকাপের অদৃশ্য যুদ্ধটি ছিল এতটাই বিস্তৃত। ১১ জুন শুরু হয়ে ১৯ জুলাই ফাইনালের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এই ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু ফুটবল ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় নয়; নিরাপত্তার দিক থেকেও এটি দেখিয়ে গেল, আধুনিক ক্রীড়া আসরে মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াইয়ের বাইরে আরও একটি দীর্ঘ ও জটিল লড়াই চলে যেখানে প্রতিপক্ষ কখনো সশস্ত্র হামলার হুমকি, কখনো অনলাইন উন্মাদনা, কখনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ভাঙার চেষ্টা এবং কখনো নিছক ভুয়া আতঙ্ক।
তবে ফাঁস হওয়া নিরাপত্তা নথির তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে এসব হুমকির কতগুলো ছিল বাস্তব হামলার প্রস্তুতি এবং কতগুলো ছিল আতঙ্ক সৃষ্টি, নজর কাড়ার চেষ্টা কিংবা উগ্র সমর্থকের বেপরোয়া আচরণ। প্রকাশিত প্রতিবেদনে সব ঘটনার চূড়ান্ত তদন্ত-ফল বা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। তাই ঘটনাগুলোকে নিশ্চিত সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা হিসেবে নয়, বরং নিরাপত্তা সংস্থার কাছে নথিভুক্ত গুরুতর হুমকি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখা বেশি যথাযথ। কিন্তু হুমকির সত্যতা শেষ পর্যন্ত মিথ্যা প্রমাণিত হলেও তার প্রতিটি তদন্ত, প্রতিটি তল্লাশি এবং প্রতিটি অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিশ্বকাপের আয়োজকদের ওপর বাস্তব চাপ তৈরি করেছে আর সেই অদৃশ্য চাপই এখন টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর প্রকাশ্যে আসা নথির মাধ্যমে ফুটবল বিশ্বের সামনে নতুন করে দৃশ্যমান হয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








