তথ্য-প্রযুক্তি ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:০৫, ৮ আগস্ট ২০২৬

প্রথমবার এআই দিয়ে নতুন ভাইরাস তৈরি করলেন মার্কিন গবেষকরা

প্রথমবার এআই দিয়ে নতুন ভাইরাস তৈরি করলেন মার্কিন গবেষকরা

ছবি: সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো প্রকৃতিতে সচরাচর দেখা যায় না—এমন নতুন ভাইরাস তৈরি করেছেন মার্কিন গবেষকরা। গবেষকদের দাবি, এটি একটি অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক সাফল্য। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি অত্যাধুনিক এই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।

সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং এমআইটি ও হার্ভার্ডের ব্রড ইনস্টিটিউটের গবেষকরা জানান, তারা প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া একটি ফাজকে টেমপ্লেট হিসেবে ব্যবহার করে এআইয়ের মাধ্যমে হাজার হাজার নতুন জিনোমের নকশা তৈরি করেছেন। ফাজ হলো এমন এক ধরনের ভাইরাস, যা ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে।

গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, গবেষকরা প্রায় ৩০০টি জিনোম রাসায়নিকভাবে সংশ্লেষণ করে পরীক্ষাগারে সেগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করেন। এতে ১৬টি কার্যক্ষম ভাইরাস পাওয়া যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এসব কৃত্রিম ভাইরাসের কয়েকটি প্রাকৃতিক ভাইরাসের তুলনায় ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসে বেশি কার্যকর।

গবেষকেরা বলছেন, এই পদ্ধতি ডাইরেক্টেড ইভোলিউশন, র‍্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সিন্থেটিক জিনোমিক্সের সক্ষমতাকে আরও সম্প্রসারিত করতে পারে। এর মাধ্যমে দ্রুত পরিবর্তনশীল রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে অভিযোজনক্ষম ফাজ থেরাপি তৈরির পথ খুলতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও বড় ও জটিল জিনোম তৈরির নকশা প্রণয়নেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে গবেষণাটি নিয়ে জৈব-নিরাপত্তার উদ্বেগও সামনে এসেছে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় ও টরন্টো জেনারেল হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ আইজ্যাক বোগোচ, যিনি গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত নন, বলেন, এ গবেষণায় একই সঙ্গে আশাব্যঞ্জক ও উদ্বেগজনক—দুই ধরনের সম্ভাবনাই রয়েছে।

আল জাজিরাকে বোগোচ বলেন, এআই দিয়ে নকশা করা ভাইরাসের কিছু সম্ভাব্য চিকিৎসাগত সুবিধা রয়েছে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাকটেরিওফাজ তৈরি করা গেলে তা নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

তবে সম্পূর্ণ ও কার্যকর ভাইরাস তৈরির এই সক্ষমতা ক্ষতিকর রোগজীবাণুর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে গুরুতর জৈব-নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। তাই প্রযুক্তির বিকাশের পাশাপাশি কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যাচাই-বাছাই ও তদারকি জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন বোগোচ।

সিডনির ইউএনএসডব্লিউ স্কুল অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড বায়োমলিকুলার সায়েন্সেসের অধ্যাপক ফাতেমেহ ভাফায়ি বলেন, বর্তমান গবেষণাটি সরাসরি মানুষের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করছে না। কারণ সংশ্লিষ্ট ফাজগুলো কেবল ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করতে পারে। তবে গবেষণায় ব্যবহৃত প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ক্ষতিকর উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ভাফায়ি বলেন, মূল উদ্বেগ নির্দিষ্ট এই ভাইরাসকে ঘিরে নয়; বরং এআই এখন এমন কাজ করতে সক্ষম—এই বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই বাস্তব কোনো বিপদের প্রতিক্রিয়ায় নয়, আগাম সতর্কতা হিসেবে জৈব-নিরাপত্তা তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

এদিকে এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে এর সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের এআই বিষয়ক তদারকি সংস্থা এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট সম্প্রতি জানিয়েছে, নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় অ্যানথ্রোপিক ও ওপেনএআইয়ের অত্যাধুনিক কিছু এআই মডেলকে মানুষের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়াই ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে দেখা গেছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এমন একটি ঘটনায় অ্যানথ্রোপিকের ক্লড মিথোস ৫ মডেল একটি ভুয়া অনলাইন পরিচয় তৈরি করে কোনো ডেভেলপার প্ল্যাটফর্মের ওপেন-সোর্স প্রকল্পে ক্ষতিকর কোড প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছিল।

তবে এআই দিয়ে ভাইরাস তৈরির সক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সিন্থেটিক জিনোম ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ টম এলিস বলেন, স্ট্যানফোর্ডের গবেষকদের ফলাফল চমকপ্রদ হলেও, এটি বড় ও জটিল ভাইরাসের জিনোম তৈরির ক্ষেত্রে এআই এখনো কতটা সীমাবদ্ধ, সেটিও দেখিয়েছে।

আল জাজিরাকে এলিস বলেন, গবেষণায় ব্যবহৃত ফাজের জিনোম তুলনামূলকভাবে ছোট ও সহজ। ফাজ জিনোম মিউটেশন ভালোভাবে সহ্য করতে পারে এবং দ্রুত বিবর্তিত হয়ে পরিবর্তনগুলো কাজে লাগাতে সক্ষম।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ ভাইরাসের জিনোম ওই ফাজের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বড়। জিনোমের আকার বাড়ার সঙ্গে এর নকশা ও তৈরির জটিলতাও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে আরও বড় ও জটিল জীবাণুর জিনোম তৈরি করা অনেক বেশি কঠিন।

এলিস আরও বলেন, জৈব-নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এআই দিয়ে নতুন রোগজীবাণু তৈরির চেয়ে প্রকৃতিতে ইতোমধ্যে বিদ্যমান রোগজীবাণুর পরিবর্তন বা ম্যানিপুলেশন অনেক বেশি তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয়।

আরও পড়ুন: আবারও আইএসপি পরিচয় ফিরে পাচ্ছেন ইন্টারনেট সেবাদাতারা

সিঙ্গাপুরের এশিয়া সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির পরিচালক সু লি ইয়াংও গবেষণাটির প্রভাব অতিরঞ্জিত না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এআই দিয়ে ভাইরাসের নকশা তৈরি করা সম্ভব হলেও এর অর্থ এই নয় যে, সামান্য বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থাকলেই কেউ ঘরে বসে জীবন রক্ষাকারী বা বিপজ্জনক ভাইরাস তৈরি করতে পারবে।

তার মতে, নকশা তৈরির পরবর্তী ধাপের জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব পরীক্ষাগার বা ওয়েট ল্যাব সক্ষমতা এখনো বড় একটি বাধা। তাই গবেষণাটিকে একই সঙ্গে মূল্যবান এবং উদ্বেগজনক- দুই দিক থেকেই দেখা উচিত। এটি মূলত দ্বৈত ব্যবহারের সম্ভাবনাসম্পন্ন গবেষণার একটি উদাহরণ। সূত্র: আল জাজিরা

নিউজবাংলাদেশ.কম/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়