নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৩:২৩, ৯ আগস্ট ২০২৬

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির দুই মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির দুই মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। 

রবিবার (০৯ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে দলের পক্ষে মনোনয়নপত্র দুটি সংগ্রহ করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এবং জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মনি। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর নামে মনোনয়নপত্র দুটি নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ। 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, একজন প্রার্থীর জন্যই মনোনয়নপত্র নেওয়া হচ্ছে; তবে ফরম পূরণ বা দাখিলের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ভুল-ত্রুটি এড়াতে দুটি ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই মনোনয়নপত্র দাখিল করা হবে। 

বিষয়টি নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একই প্রার্থীর জন্য একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিদ্যমান বিধিতে রয়েছে। ফলে দুটি ফরম সংগ্রহকে একাধিক প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় কারিগরি বা আনুষ্ঠানিক ত্রুটি এড়ানোর একটি প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

বিএনপির দুই মনোনয়নপত্র সংগ্রহের মধ্য দিয়ে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কার্যত আরও দৃশ্যমান পর্যায়ে প্রবেশ করল। নির্বাচন কমিশন গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে। ১৬ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে নির্বাচন কমিশন ভবনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। কোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে চাইলে ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত সময় পাবেন। এরপরও যদি একাধিক বৈধ প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে থাকেন, তাহলে ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নির্বাচনী কর্তা বা রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। 

নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ৫(৩) ধারা অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করেছেন। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে এবং তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ২০ আগস্টের ভোটগ্রহণ নির্ভর করছে মনোনয়নপত্র যাচাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর কয়জন বৈধ প্রার্থী থাকছেন তার ওপর। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন এবং নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করে। কোনো নির্বাচনে যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের পর যদি একজন মাত্র বৈধ প্রার্থী অবশিষ্ট থাকেন, তাহলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয় না; নির্বাচন কমিশন তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করতে পারে। 

অন্যদিকে একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যরা ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়, তবে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রতিটি মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্য প্রস্তাবক এবং আরেকজন সংসদ সদস্য সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর করেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর সম্মতিও প্রয়োজন হয়। ফলে বিএনপি রবিবার দুটি ফরম সংগ্রহ করলেও প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রার্থীর নাম স্পষ্ট হবে মনোনয়নপত্র দাখিল এবং পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ের পর।

আরও পড়ুন: আ.লীগ এবং শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দাফন হয়েছে: সালাহউদ্দিন

একই প্রার্থীর জন্য একাধিক মনোনয়নপত্র সংগ্রহের নজির বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আগেও রয়েছে। ২০২৩ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি পদে মো. সাহাবুদ্দিনের জন্য দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিল করেছিল। পরবর্তী প্রক্রিয়ায় একটি মনোনয়নপত্র বৈধ হলে অন্যটি কার্যত আর প্রয়োজনীয় থাকেনি। এবারও বিএনপির পক্ষ থেকে দুটি ফরম নেওয়ার ক্ষেত্রে একই ধরনের সতর্কতামূলক কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্রের বক্তব্যে উঠে এসেছে। 

চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দুটি ফরম কোনো দুই ব্যক্তির নামে নেওয়া হয়নি; একজন প্রার্থীর জন্যই ফরম নেওয়া হয়েছে। ফলে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের এই ঘটনা থেকে বিএনপির রাষ্ট্রপতি পদে দুই প্রার্থী দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের পেছনে রয়েছে সদ্য সৃষ্ট সাংবিধানিক শূন্যতা। দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। তিনি সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকারের উদ্দেশে পদত্যাগপত্র দেন এবং স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তা গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তার পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়। সংবিধানের ১২৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনও জানিয়েছে, সেই সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যেই ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তৈরি হয়েছিল। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সংবিধান ও বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী হবে, নাকি রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে প্রণীত জুলাই সনদের আলোকে নতুন কোনো কাঠামোতে নির্বাচন হবে এ নিয়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকে মতামত এসেছে। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে জুলাই সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়োজনের দাবি জানিয়েছিল। 

দলটির বক্তব্য ছিল, প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধন সম্পন্ন করে নতুন কাঠামোর অধীনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা উচিত। তবে নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ এবং সাংবিধানিক বিধান অনুসরণ করেই তফসিল ঘোষণা করেছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকায় রয়েছেন জাতীয় সংসদের সদস্যরা। ফলে সরাসরি জনগণের ভোটে নয়, সংসদ সদস্যদের ভোটেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন। বর্তমান সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটি যে প্রার্থী দেবে, তার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। তবে মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম নিশ্চিত নয় এবং একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট সংসদে ভোট হবে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ না হওয়ার ইতিহাসও রয়েছে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতার নজির খুব সীমিত। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করেছিলেন; তিনি পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। এরপরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলোতে মূলত একজন প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। এবারও বিএনপির সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং দলের পক্ষ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে এর উত্তর মিলবে ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিল এবং ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাইয়ের পর।

সব মিলিয়ে বিএনপির দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এখন নজর ১৩ আগস্টের দিকে কাকে প্রার্থী করে বিএনপি, কতটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে এবং অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসেন কি না, সেটিই হবে নির্বাচনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ১৬ আগস্ট বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা পরিষ্কার হওয়ার পরই বোঝা যাবে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হবে কি না। আর একক প্রার্থী থাকলে ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে। 

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত বর্তমান তফসিল অনুযায়ী, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ২০ আগস্টই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়