১১ পলিথিনে নারীর খণ্ডিত লাশ, নিখোঁজ মাথা-পা
ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লার দেবিদ্বারে নিখোঁজের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এক গৃহবধূকে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডিত করে পলিথিনের প্যাকেটে ভরে বস্তাবন্দী করে বাড়ির পেছনে ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিহতের বাড়ির ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তারকে (৩৫) আটক করেছে পুলিশ। স্থানীয়রা তাকে আটক করে মারধর করে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখার পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নেয়।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লাইলী হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন এবং আরও কয়েকজনের নাম বলেছেন। তবে তার কথিত স্বীকারোক্তির আইনগত সত্যতা ও হত্যাকাণ্ডে অন্যদের সংশ্লিষ্টতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি এখনো বাকি।
শনিবার (০৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় দেবিদ্বার পৌর এলাকার ছোট আলমপুরের মোহনা আবাসিক এলাকায় দেবিদ্বার দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়ার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত নারীর পরিচয় বিভিন্ন প্রতিবেদনে ফরিদা বেগম ও ফরিদা ইয়াসমিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; বয়সও কোথাও ৫০, কোথাও ৫৫ বছর বলা হয়েছে।
তবে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে তিনি মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্ত্রী এবং ওই বাড়ির মালিক। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত নিহতের নাম ও বয়সের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক নথিভিত্তিক নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ বছর আগে ওই এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া ও তার পরিবার। মফিজুল ইসলাম চট্টগ্রামে একটি জাহাজে চাকরি করেন। তাদের দুই মেয়ে রাবেয়া বসরী ও মরিয়ম আক্তারের বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে স্বামী কর্মস্থলে থাকায় এবং মেয়েরা নিজ নিজ সংসারে চলে যাওয়ায় ওই বাড়িতে একাই থাকতেন গৃহবধূটি। বাড়ির একটি কক্ষ ভাড়া দেওয়া হয়েছিল লাইলী আক্তার ও তার স্বামী আবুল কালাম আজাদের কাছে।
স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত নারী ডায়াবেটিসে ভুগতেন এবং প্রতিদিন সকালে হাঁটতে বের হতেন। শনিবার সকালেও তিনি বাড়ি থেকে বের হন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিন সকালে ছোট মেয়ে মরিয়ম আক্তার বাবার বাড়িতে এসে মাকে দেখতে না পেয়ে প্রথমে আশপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। স্বজনেরা আত্মীয়স্বজনের বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় খোঁজ নেন। কোথাও সন্ধান না পেয়ে পরে এলাকায় মাইকিং করা হয়। স্বজনদের অভিযোগ, নিখোঁজের বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বিকেলের দিকে নিহতের বোনের ছেলে মামুন বাড়ির পেছনে কয়েকটি পলিথিনের প্যাকেট দেখতে পান। প্যাকেটগুলোর ভেতরে মানুষের মরদেহের অংশ রয়েছে সন্দেহ হলে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পলিথিনে মোড়ানো খণ্ডিত মরদেহের প্যাকেট উদ্ধার করে। সন্ধ্যার পর ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং বাড়িটির সামনে স্থানীয়দের ভিড় জমে যায়।
আরও পড়ুন: ১১ পলিথিনে নারীর খণ্ডিত লাশ, নিখোঁজ মাথা-পা
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, হত্যার পর মরদেহটি খণ্ডিত করা হয়েছিল। পরে দেহের বিভিন্ন অংশ পলিথিনে আলাদা আলাদা করে মুড়িয়ে বস্তায় ভরে বাড়ির পেছনে লুকিয়ে রাখা হয়। তবে উদ্ধার হওয়া প্যাকেটের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। কোথাও ১১টি পলিথিনের প্যাকেটের কথা বলা হয়েছে, আবার পুলিশের বরাত দিয়ে অন্য প্রতিবেদনে ৯টি প্যাকেট উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, পলিথিনে মোড়ানো খণ্ডিত মরদেহের কয়েকটি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, মরদেহের মাথা ও পা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর নিহতের বাড়ির ভাড়াটিয়া লাইলী আক্তারের ওপর সন্দেহ করেন স্থানীয়রা। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ লোকজন তাকে আটক করে মারধর করেন এবং বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। পরে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে সেখানেও বিক্ষুব্ধ লোকজন অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর বিপুলসংখ্যক পুলিশ গিয়ে লাইলীকে সেখান থেকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
পুলিশের ভাষ্য, থানায় নেওয়ার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে লাইলী আক্তার ওই নারীকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তার দেওয়া তথ্যে নিহতের মরদেহ গুম ও হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগে তার স্বামী আবুল কালাম আজাদ ছাড়াও রবিউল, সোহেল ও ইমন নামের আরও তিনজনের নাম এসেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে তাদের কেউ এখনো আটক হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ বলছে, নামগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যদের আটকের চেষ্টা চলছে।
দেবিদ্বার থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, পলিথিনে মোড়ানো খণ্ডিত মরদেহের কয়েকটি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। মরদেহের মাথা ও পা এখনো পাওয়া যায়নি। আটক লাইলীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরও চারজনের নাম পাওয়া গেছে। তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে।
এদিকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা মরদেহের অংশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ, কীভাবে এবং কখন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, মরদেহ খণ্ডিত করার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল এবং হত্যার পর তা গোপন করার পরিকল্পনায় আর কেউ ছিল কি না এসব বিষয় তদন্ত করছে পুলিশ। একই সঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত সময়ের ঘটনাপ্রবাহও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাটিকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে একই বাড়িতে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার বসবাস এবং বাড়ির পেছন থেকে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে স্থানীয়দের অভিযোগ বা আটক ব্যক্তির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত এবং পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া মরদেহের সব অংশ খুঁজে বের করা, ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ, আটক লাইলীর বক্তব্য যাচাই এবং সন্দেহভাজন অন্য ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় এখনো মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া ও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








