স্পোর্টস ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১২:৪৪, ৯ আগস্ট ২০২৬

ভক্তের জাতীয় পতাকায় সাকিবের অটোগ্রাফ

ভক্তের জাতীয় পতাকায় সাকিবের অটোগ্রাফ

ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ অনুপস্থিতির মধ্যেও প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে নিজের উপস্থিতি ধরে রেখেছেন বাংলাদেশের তারকা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। দেশের মাটিতে দীর্ঘদিন দেখা না গেলেও বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে তাকে নিয়মিতই মাঠে দেখা যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবারের লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে (এলপিএল) জাফনা কিংসের হয়ে খেলে আবারও আলোচনায় এসেছেন তিনি। তবে এবার মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি একটি আবেগঘন মুহূর্তও সাকিবকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। 

কলম্বোর আর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে এলপিএলের ফাইনাল শেষে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় অটোগ্রাফ দিয়ে এক বাংলাদেশি সমর্থকের আবদার পূরণ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে এক খুদে ভক্তের ছোট ব্যাটেও অটোগ্রাফ দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়ক। ম্যাচে জাফনা কিংস শিরোপা জিততে না পারলেও সাকিবের এই আচরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে নতুন করে ভক্তদের আবেগের জায়গা তৈরি করেছে।

ফাইনাল শেষে ড্রেসিংরুমের দিকে ফিরছিলেন সাকিব। সে সময় গ্যালারি থেকে এক বাংলাদেশি সমর্থক তাকে ডাকেন। হাতে থাকা লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা দেখে সাকিবও গ্যালারির দিকে এগিয়ে যান এবং পতাকার ওপর অটোগ্রাফ দেন। এরপর আরেক খুদে ভক্ত তার হাতে একটি ছোট ব্যাট তুলে দিলে সেখানেও স্বাক্ষর করেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটার বিদেশের মাটিতে জাতীয় পতাকা দেখে নিজে থেকে ভক্তের কাছে এগিয়ে যাওয়া এবং তার আবদার পূরণ করার দৃশ্যটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ফাইনালের ফলাফলের বাইরেও সাকিবের এই মুহূর্তটি বাংলাদেশি ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে বিশেষ আলোচনার জন্ম দেয়।

এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সাকিব আর বাংলাদেশে ফেরেননি। একই সময় থেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটেও তাঁর উপস্থিতি বন্ধ। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ তিনি খেলেছেন ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে। এরপর দেশের ক্রিকেট থেকে দূরে থাকলেও ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে সক্রিয় থাকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন ৩৯ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার। চলতি বছর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও তাকে ঘিরে জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ রাখেনি; জানুয়ারিতে বিসিবি জানিয়েছিল, তাঁর প্রাপ্যতা, ফিটনেস এবং ম্যাচ ভেন্যুতে উপস্থিত থাকার সক্ষমতা বিবেচনায় তাঁকে নির্বাচনের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার জন্য এনওসি দেওয়ার বিষয়েও বোর্ড ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছিল।

এলপিএলের ফাইনালে অবশ্য ব্যাট হাতে সাকিব নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। টস জিতে আগে ব্যাটিং করা জাফনা কিংস ১৯.৩ ওভারে মাত্র ১২৩ রানে অলআউট হয়। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৪১ রান করেন কামিল মিশারা। ৩২ বলে পাঁচটি চারে এই ইনিংস খেলেন তিনি। শুরুতে জাফনা ভালো অবস্থানে থাকলেও নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকায় বড় সংগ্রহ গড়তে পারেনি। ওপেনার আভিষ্কা ফার্নান্দো ২০ রান করে ফেরার পর খাজা নাফে, তাওহীদ হৃদয়, অধিনায়ক ভানুকা রাজাপাকসে ও দুনিথ ওয়েল্লালাগে বড় জুটি গড়তে পারেননি। একপর্যায়ে ১০ ওভারে জাফনার স্কোর দাঁড়ায় ৬৬ রানে ৪ উইকেট, পরে ৬৮ রানে ৫ উইকেট। শেষদিকে কামিল মিশারার ৪১ এবং চামিন্দু উইক্রামাসিংহের ২৪ রানের ইনিংস জাফনাকে কোনোমতে ১২৩ পর্যন্ত নিয়ে যায়। ফাইনালে এটিই ছিল এলপিএল-৬-এর সর্বনিম্ন দলীয় সংগ্রহ।

আরও পড়ুন: সাকিবের প্রত্যাবর্তনে সরকারের না

সাকিব ব্যাট করতে নেমে ১২ বলে করেন ৯ রান। জাফনার ইনিংসের ১৬তম ওভারে এশান মালিঙ্গার বলে সাচিন্দু কলম্বাগের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি। বাংলাদেশের আরেক ক্রিকেটার তাওহীদ হৃদয়ও ফাইনালে বড় অবদান রাখতে পারেননি; তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১০ রান। তবে ফাইনালের আগের ম্যাচগুলোতে হৃদয় ছিলেন জাফনার অন্যতম সফল ব্যাটসম্যান। আগের চার ম্যাচে ১৪১ রান করার পর ফাইনালে ১০ রান যোগ করে পাঁচ ইনিংসে তাঁর মোট সংগ্রহ দাঁড়ায় ১৫১। তিনবার অপরাজিত থাকায় তাঁর ব্যাটিং গড় দাঁড়ায় ৭৫.৫০।

ব্যাট হাতে ব্যর্থ হলেও বল হাতে ফাইনালে কার্যকর ছিলেন সাকিব। চার ওভারের কোটা পূরণ করে মাত্র ১৫ রান খরচে নেন ২ উইকেট। তাঁর ২৪ বলের মধ্যে ১৫টিই ছিল ডট বল। গল গ্যালান্টসের রান তাড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ দুটি উইকেটও তুলে নেন তিনি। প্রথমে সেট হয়ে যাওয়া টমাস রজার্সকে ৩৪ রানে ফেরান সাকিব। এরপর দিনুরা কালাপাহানাকে ৩১ রানে বোল্ড করে গলকে আবারও চাপের মধ্যে ফেলেন। ফলে জাফনা অল্প রানের পুঁজি নিয়ে লড়াই করার সুযোগ পেলেও অন্য বোলাররা সেই চাপ ধরে রাখতে পারেননি।

১২৪ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে গল গ্যালান্টস শুরুতেই কিছুটা চাপে পড়েছিল। মাত্র ১০ রানের মধ্যে দুই উইকেট হারায় তারা। তবে টমাস রজার্স ও দিনুরা কালাপাহানার ৬৪ রানের জুটি ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেয়। রজার্স ২৭ বলে ৩৪ এবং কালাপাহানা ১৯ বলে ৩১ রান করে গলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেন। সাকিব রজার্সকে ফিরিয়ে জাফনাকে আবার ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেন এবং পরে কালাপাহানাকেও আউট করেন। কিন্তু এরপর অধিনায়ক দাসুন শানাকা ও সাহান আরাচ্চিগে দায়িত্ব নিয়ে দলকে জয় এনে দেন। শানাকা মাত্র ৯ বলে অপরাজিত ২০ রান করেন, আর আরাচ্চিগে ১৯ বলে অপরাজিত থাকেন ১৪ রানে। ১৫.৫ ওভারে ৫ উইকেট হারিয়ে ১২৬ রান করে পাঁচ উইকেটে ম্যাচ জিতে নেয় গল গ্যালান্টস। অর্থাৎ ২৫ বল হাতে রেখেই শেষ হয় ফাইনাল।

ফাইনালে গল গ্যালান্টসের জয়ের নায়ক ছিলেন চারিত আসালাঙ্কা। ব্যাট হাতে বড় অবদান রাখার সুযোগ না পেলেও বল হাতে চার ওভারে মাত্র ২০ রান দিয়ে নেন ৩ উইকেট। সেই পারফরম্যান্সের জন্য ম্যাচসেরার পুরস্কারও পান তিনি। এশান মালিঙ্গাও তিন উইকেট নিয়ে জাফনার ব্যাটিং ধস ত্বরান্বিত করেন। পুরো টুর্নামেন্টে ১৭ উইকেট নিয়ে মালিঙ্গা এলপিএল-৬-এর সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি তথা পার্পল ক্যাপ জেতেন। বিদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সাম হার্পার ১১ ইনিংসে ৪২৫ রান করে টুর্নামেন্টের অন্যতম সফল ব্যাটসম্যান হিসেবে আসর শেষ করেন।

ফাইনালে হারলেও এবারের এলপিএলে সাকিবের ব্যক্তিগত বোলিং পারফরম্যান্স ছিল উল্লেখযোগ্য। চার ইনিংসে ব্যাট করার সুযোগ পেয়ে তাঁর সংগ্রহ ৪১ রান, ব্যাটিং গড় ২০.৫০ এবং স্ট্রাইক রেট ১১৭.১৪। বল হাতে ৭.৭৯ ইকোনমিতে ১১ উইকেট নিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতার ঘাটতি থাকলেও বল হাতে জাফনার বোলিং আক্রমণে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফাইনালের চার ওভারে ১৫ রান দিয়ে দুই উইকেট নেওয়া সেই পারফরম্যান্সেরই আরেকটি উদাহরণ।

এবারের এলপিএলের ফাইনালটি জাফনা কিংসের জন্য ছিল শিরোপা ধরে রাখার লড়াই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গল গ্যালান্টসের কাছে পাঁচ উইকেটে হেরে রানার্সআপ হয় তারা। গল গ্যালান্টসের জন্য এটি ছিল বিশেষ অর্জন—ফ্র্যাঞ্চাইজিটি প্রথমবারের মতো এলপিএলের শিরোপা জেতে। শ্রীলঙ্কার এই ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিযোগিতায় জাফনা কিংস চারবারের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ফাইনালে নেমেছিল; এবার তাদের থামিয়ে নিজেদের প্রথম শিরোপা নিশ্চিত করে গল।

ফলে সাকিবের জন্য এলপিএলের এবারের অধ্যায়টি শেষ হলো মিশ্র অভিজ্ঞতায়। দলগতভাবে শিরোপা হাতছাড়া হয়েছে, ব্যাট হাতে প্রত্যাশিত অবদান রাখা সম্ভব হয়নি; কিন্তু বল হাতে কার্যকর পারফরম্যান্স, পুরো টুর্নামেন্টে ১১ উইকেট এবং সর্বোপরি ফাইনাল শেষে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ও এক খুদে ভক্তের ব্যাটে অটোগ্রাফ দেওয়ার দৃশ্য তাঁকে আবারও বাংলাদেশি ক্রিকেটপ্রেমীদের আলোচনায় নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর বিদেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগই এখন সাকিবের ক্রিকেট-জীবনের প্রধান মঞ্চ। আর সেই মঞ্চেও দেশের পতাকা সামনে এলে তাঁর প্রতিক্রিয়া যে এখনো ভক্তদের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, কলম্বোর রাতের সেই দৃশ্যই তার নতুন প্রমাণ হয়ে থাকল।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়