স্পোর্টস ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:০৭, ৭ আগস্ট ২০২৬

সাকিবের প্রত্যাবর্তনে সরকারের ‘না’

সাকিবের প্রত্যাবর্তনে সরকারের ‘না’

ফাইল ছবি

প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক ও বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের দেশে ফেরা এবং জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তন নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে তিনি সরকারের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলে দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতিতে তার দেশে ফিরে জাতীয় দলের হয়ে খেলার কোনো সুযোগ নেই। ফলে দেশের মাটিতে বিদায়ী সিরিজ খেলার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই দেশে ফেরেননি সাকিব। সে সময় তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা দায়ের হয়। পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কারণে দেশে ফিরতে পারেননি তিনি। এমনকি ২০২৪ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মিরপুরে নিজের বিদায়ী টেস্ট খেলতে চাইলেও দুবাই পর্যন্ত এসে ফিরে যেতে হয়েছিল।

বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ (এলপিএল) খেলতে থাকা সাকিব আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সরকার যদি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে তিনি দেশে ফিরে আদালতের বিচারসহ সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। 

তার ভাষায়, তিনি কোনো অপরাধ করেননি এবং নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। একই সঙ্গে দেশের মাটিতে একটি বিদায়ী আন্তর্জাতিক সিরিজ খেলা এবং ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে অংশ নেওয়ার ইচ্ছার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।

সাক্ষাৎকারে সাকিব আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তার আইনজীবীর মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র, আইন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো প্রত্যাহারের আবেদন জানানো হয়েছিল। তবে সেই আবেদনের কোনো জবাব তিনি পাননি। দেশে ফেরার বিষয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।

দুই বছরের বেশি সময় ধরে বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে না পারার বিষয়টিও তুলে ধরেন সাবেক এই অধিনায়ক। 

তিনি বলেন, তার বাবা-মা বাংলাদেশেই রয়েছেন, কিন্তু তাদের দেশ ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পুরো পরিবারই কঠিন সময় পার করছে, তবে তারা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। 

একই সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তার পারিবারিক বাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

আরও পড়ুন: লিজেন্ডস লিগে টাইগার্সের নেতৃত্বে সাকিব

তবে সাকিবের এই অবস্থানের পর সরকারের প্রতিক্রিয়া এসেছে আরও কঠোর ভাষায়। 

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ক্রিকেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ক্রিকবাজকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাকিবের দেশে ফিরে জাতীয় দলের হয়ে খেলার কোনো সুযোগ তিনি দেখছেন না।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়, একজন ক্রিকেটার হিসেবে সাকিবের যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল, রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। ফলে তাকে এখন আর শুধু একজন ক্রিকেটার হিসেবে দেখা সম্ভব নয়। 

তিনি বলেন, দেশে ফিরলে তাকে অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং সরকারের পক্ষ থেকে আগের মতো নমনীয় অবস্থান রাখার সুযোগ আর নেই।

আমিনুল হক আরও বলেন, সরকার এতদিন সাকিবের বিষয়টি একজন জাতীয় ক্রিকেটারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করেছিল। কিন্তু সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তার অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। 

তার দাবি, একজন খেলোয়াড় হিসেবে যেটুকু সহনশীলতা দেখানো হয়েছিল, এখন আর সেই অবস্থানে থাকার সুযোগ নেই।

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বর্তমান পরিচালক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর। ক্রিকবাজকে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর সাকিবের ক্রিকেটীয় পরিচয়ের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ই এখন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। 

তার মতে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একই ভার্চুয়াল মঞ্চে উপস্থিত হওয়া থেকেই সাকিবের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। ফলে তিনি রাজনৈতিক পরিচয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং এর মূল্যও তাকে দিতে হবে।

আলমগীরের মতে, ভবিষ্যতে জাতীয় দলে ফিরতে চাইলে সাকিবকে প্রথমে সব আইনি জটিলতা থেকে মুক্ত হতে হবে। এরপর জাতীয় দলের অন্যান্য ক্রিকেটারের মতোই ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। তবে বয়স, দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকা এবং বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় তার ফেরার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলেই মনে করেন তিনি।

এর আগে চলতি বছরের শুরুতে একাধিক সাক্ষাৎকারে সাকিব জানিয়েছিলেন, ক্রিকেটের জন্য এখনও তার ক্ষুধা শেষ হয়ে যায়নি। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে তিনি ভালো খেলছেন এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নেওয়ার আগে দেশের দর্শকদের সামনে শেষবারের মতো খেলতে চান। 

তিনি বলেছিলেন, রাজনীতির জন্য সামনে অনেক সময় পড়ে আছে, কিন্তু ক্রিকেট ক্যারিয়ারের সময় খুব সীমিত।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সাকিব আল হাসানের দেশে ফেরা এখন কেবল নিরাপত্তা বা আইনি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। সরকারের সর্বশেষ অবস্থান এবং বিসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে, আইনি জটিলতা নিরসন হলেও জাতীয় দলে তার প্রত্যাবর্তনের পথ সহজ হবে না। ফলে দেশের মাটিতে বিদায়ী সিরিজ খেলা কিংবা ২০২৭ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জার্সিতে মাঠে নামার যে স্বপ্ন সাকিব এখনও লালন করছেন, তার বাস্তবায়ন এখন অনেকটাই অনিশ্চয়তার মুখে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়