সৌদি আরবের জুবাইল ও জিজানে বিস্ফোরণ-অগ্নিকাণ্ড
ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ দুই জ্বালানি ও শিল্পাঞ্চল জিজান ও জুবাইলে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
রবিবার (০৯ আগস্ট) দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জিজানে সৌদি আরামকোর একটি শোধনাগার-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় আগুন লাগার কথা নিশ্চিত করেছে সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
একই সময়ে পূর্বাঞ্চলের শিল্পনগরী জুবাইলে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা এবং একটি গ্যাস স্থাপনায় আগুন লাগার খবর দিয়েছে কয়েকটি আরব ও আঞ্চলিক সূত্র। তবে জুবাইলের ঘটনার প্রকৃতি, বিস্ফোরণের কারণ, কোনো হামলা হয়ে থাকলে তার ধরন এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। ফলে দুই অঞ্চলের ঘটনাকে একই হামলার অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ থাকলেও এ মুহূর্তে তাদের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জিজান অঞ্চলে সৌদি আরামকোর শোধনাগার-সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনায় ভোরের দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আরামকোর শিল্প নিরাপত্তা বিভাগের অগ্নিনির্বাপণ দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঘটনায় কেউ নিহত বা আহত হননি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। তবে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, সেটি দুর্ঘটনা, যান্ত্রিক ত্রুটি নাকি কোনো বহিরাগত হামলার ফল এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক বিবৃতিতে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। ফলে জিজানের অগ্নিকাণ্ডকে সরাসরি হামলা হিসেবে চিহ্নিত করার মতো সরকারি তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
জিজানের ঘটনার পাশাপাশি একই দিনে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় জুবাইল থেকে আসে বিস্ফোরণের খবর। আঞ্চলিক সূত্রগুলোর বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, জুবাইল এলাকায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং পরে জুবাইল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির একটি গ্যাস স্থাপনায় আগুন দেখা যায়। কয়েকটি আরব সূত্র দাবি করেছে, স্থাপনাটি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকতে পারে। তবে এসব দাবির পক্ষে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। বিস্ফোরণটি কোনো ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ধ্বংসাবশেষ, শিল্প দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে হয়েছে কি না, সেটিও পরিষ্কার নয়। একইভাবে কথিত হামলায় স্থাপনার কতটা ক্ষতি হয়েছে বা কোনো হতাহত হয়েছে কি না, সে সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
জুবাইলের ঘটনা নিয়ে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রতিবেদনে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটিকে এখনো একটি অভিযোগ বা সন্দেহ হিসেবেই দেখা হচ্ছে; সৌদি কর্তৃপক্ষ জুবাইলের বিস্ফোরণের জন্য হুথিদের দায়ী করেনি। ফলে প্রমাণিত তথ্য ও আঞ্চলিক সূত্রের দাবির মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনানুষ্ঠানিক সূত্রে দ্রুত বিভিন্ন দাবি ছড়িয়ে পড়ায় ঘটনার প্রকৃত ধরন নিশ্চিত করতে সরকারি তদন্ত ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
জিজানে রোববারের আগুনের ঘটনাটিও এমন এক সময়ে ঘটল, যখন সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আঞ্চলিক সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। এর আগে ২৫ জুলাই ইয়েমেনের হুথিরা জিজান ও ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছিল। হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছিলেন, জিজানে আরামকোর সংবেদনশীল স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ সে সময় হামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নিশ্চিত না করলেও রয়টার্সের প্রতিবেদনে জিজানের আরামকো শোধনাগারের দিক থেকে ধোঁয়া ওঠার ভিডিও যাচাইয়ের কথা উল্লেখ করা হয়। গ্রিক নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স আরও জানিয়েছিল, ইয়ানবুর জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করে।
আরও পড়ুন: দায়িত্ব নিয়েই জোড়া বোমা হামলার মুখে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট
জিজানের ওই হামলার পর পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। রয়টার্সের বরাত দিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, হামলায় জিজানের দৈনিক ৪ লাখ ব্যারেল সক্ষমতার আরামকো শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। একটি শিল্প-পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের নোটে বলা হয়, শোধনাগারের ইন্টিগ্রেটেড গ্যাসিফিকেশন কম্বাইন্ড সাইকেল কমপ্লেক্স এবং ট্যাংক ফার্ম এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল এবং ১৫ আগস্টের মধ্যে মেরামত শেষ করে পুনরায় চালুর সম্ভাব্য পরিকল্পনা ছিল। তবে ৯ আগস্টের নতুন অগ্নিকাণ্ডটি ওই আগের ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
জিজান সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লোহিত সাগরের তীরবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র। সেখানে আরামকোর বড় শোধনাগারটির দৈনিক অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা প্রায় ৪ লাখ ব্যারেল। একই কারণে অঞ্চলটি শুধু সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহের জন্য নয়, বরং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থার জন্যও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতার মধ্যে সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় বন্দরগুলো বিকল্প রপ্তানি পথ হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জিজানের অবস্থান ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় অঞ্চলটি নিরাপত্তার দিক থেকেও বিশেষভাবে স্পর্শকাতর।
অন্যদিকে, জুবাইল সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পকেন্দ্র এবং দেশটির জ্বালানি, পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত, সার, পানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। জুবাইল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে সৌদি আরামকো, সৌদি বেসিক ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (SABIC)সহ বিভিন্ন বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্থাপনা রয়েছে। ফলে সেখানে কোনো বড় ধরনের বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব শুধু স্থানীয় নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ না থেকে সৌদি আরবের শিল্প উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জুবাইলের বিভিন্ন জ্বালানি ও শিল্প স্থাপনা আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে বলে সৌদি সরকারি নথিতেও উঠে এসেছে।
সৌদি প্রেস এজেন্সির প্রকাশিত সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এর আগের হামলাগুলোতে জুবাইলের বড় পরিশোধনাগার, রিফাইনারি ও অন্যান্য জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট স্থাপনার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, জুবাইলের SATORP, রাস তানুরা রিফাইনারি, ইয়ানবুর SAMREF এবং রিয়াদ রিফাইনারিসহ কয়েকটি স্থাপনায় হামলার প্রভাব পড়েছিল; জুয়াইমাহর প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনায় আগুনের কারণে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও প্রাকৃতিক গ্যাস তরল রপ্তানিও প্রভাবিত হয়েছিল। একই বিবৃতিতে পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের একটি পাম্পিং স্টেশনে হামলার ফলে দৈনিক প্রায় ৭ লাখ ব্যারেল পরিবহন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। এসব তথ্য বর্তমান জুবাইলের ঘটনার তাৎপর্য বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ৯ আগস্টের বিস্ফোরণের সঙ্গে আগের ঘটনাগুলোর সরাসরি সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
জুবাইলে আজকের বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের খবর এমন একটি সময় এসেছে, যখন সৌদি আরবের শিল্প অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার করা নিয়ে দেশটির সরকারি পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জুবাইল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে জরুরি সাড়া ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শিল্প স্থাপনার নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বিত প্রতিক্রিয়া এবং সম্পদ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে নতুন কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সেটি শিল্প নিরাপত্তা ও প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জিজান ও জুবাইলের ঘটনাকে আলাদা করে দেখাও গুরুত্বপূর্ণ। জিজান লোহিত সাগর ও ইয়েমেন সীমান্তসংলগ্ন হওয়ায় হুথি হামলার সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিপরীতে জুবাইল সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে পারস্য উপসাগরীয় শিল্পাঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এবং দেশটির বৃহৎ পেট্রোকেমিক্যাল ও জ্বালানি অবকাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে একই দিনে দুই ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় আগুন ও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে দুই ঘটনার মধ্যে সমন্বিত হামলা বা অভিন্ন কোনো পরিকল্পনার দাবি নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ নেই।
এরই মধ্যে জিজানের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কথা জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ এবং এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। জুবাইলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত সরকারি বিবৃতি না আসায় সেখানে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না, স্থাপনার কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে কি না কিংবা উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো প্রভাব পড়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। একইভাবে কোনো স্থাপনায় সরাসরি হামলা হয়ে থাকলে সেটির দায় কার, কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোনো হুমকি শনাক্ত বা প্রতিহত করেছে কি না, সেসব তথ্যও আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি।
সব মিলিয়ে, রোববারের ঘটনাগুলো সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জিজানে আরামকো-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় আগুন লাগার বিষয়টি সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করলেও এর কারণ এখনো অজানা। অন্যদিকে জুবাইলে বিস্ফোরণ ও গ্যাস স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের খবর মূলত আঞ্চলিক সূত্রনির্ভর এবং কথিত হামলার বিষয়টি এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। ফলে পরবর্তী সময়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের তদন্ত, ক্ষয়ক্ষতির আনুষ্ঠানিক হিসাব এবং জুবাইলের ঘটনার উৎস সম্পর্কে কোনো সরকারি ঘোষণা এলে দুই ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে। আপাতত নিশ্চিত তথ্য হলো—জিজানে আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং কোনো হতাহতের খবর নেই; আর জুবাইলে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে তদন্ত ও তথ্য যাচাই এখনো চলছে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, রয়টার্স
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








