News Bangladesh

স্পোর্টস ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:১৪, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

নারী ক্রিকেটে নিরাপত্তা ও সংস্কারে তামিমের কড়া বার্তা

নারী ক্রিকেটে নিরাপত্তা ও সংস্কারে তামিমের কড়া বার্তা

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রশাসনিক কাঠামোয় নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটিয়ে বিসিবির অ্যাডহক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একাধিক কাঠামোগত সংস্কার, নীতিগত পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছেন সাবেক জাতীয় অধিনায়ক তামিম ইকবাল। খেলোয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি বোর্ড পরিচালনায় পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন, যেখানে আবেগ নয়, বরং কৌশলগত ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পাবে।

ক্রিকেটভিত্তিক আন্তর্জাতিক মাধ্যম ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও বর্তমানে তার কাছে বড় অগ্রাধিকার হলো নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বোর্ড নির্বাচন সম্পন্ন করা এবং ক্রিকেটের হারানো জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারে ‘ফিউচার স্টার্স’ বা ভবিষ্যৎ তারকাদের গড়ে তোলা। খেলোয়াড় থেকে প্রশাসক হিসেবে এই উত্তরণকে তামিম দেখছেন ব্যক্তিগত ইগো বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ রক্ষার চ্যালেঞ্জ হিসেবে।

সাক্ষাৎকারে তামিম স্পষ্ট করেছেন, অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং বোর্ড সভাপতির দায়িত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। যেখানে আগে তার মনোযোগ সীমাবদ্ধ ছিল দল ও মাঠের পারফরম্যান্সে, এখন তাকে ভাবতে হচ্ছে পুরো কাঠামো খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমনকি সমর্থকদের অভিজ্ঞতা নিয়েও। 

সভাপতির চেয়ারে বসে ব্যক্তিগত অহং বা আবেগের কোনো স্থান নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নিয়েই প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বোর্ড পরিচালনায় হস্তক্ষেপহীন পেশাদার কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তামিম। নির্বাচক প্যানেলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দল নির্বাচনে যোগ্যতা ও পারফরম্যান্সকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। অতীতের মতো খেলোয়াড় বা নির্বাচকদের ওপর প্রকাশ্যে দায় চাপানোর সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসার কথা জানিয়েছেন। 

তার মতে, ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করাই পারফরম্যান্স উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

নারী ক্রিকেট নিয়ে তামিমের অবস্থান সবচেয়ে স্পষ্ট ও কঠোর। গত কয়েক বছরে সৃষ্ট বিতর্ক ও অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি স্বীকার করেছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা ছিল। এই বাস্তবতা থেকেই নারী ক্রিকেটারদের জন্য ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। 
তার মতে, উন্নয়ন বা বিশ্বকাপের চেয়েও বড় বিষয় হলো খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অভিভাবকরা যেন নিশ্চিন্তে তাদের সন্তানদের বোর্ডের অধীনে পাঠাতে পারেন এই আস্থা পুনর্গঠনই এখন তার প্রধান লক্ষ্য।

দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে মাঠের বাইরেও কিছু প্রতীকী উদ্যোগ নিয়েছেন তামিম। দীর্ঘদিন পর ফিরিয়ে আনা হয়েছে ‘বল বয়’ সংস্কৃতি, তবে নতুন নামে ‘ফিউচার স্টার্স’। তার মতে, এই খুদে ক্রিকেটাররাই ভবিষ্যতের প্রতিনিধিত্ব করে, তাই তাদের পরিচয়ও হতে হবে অনুপ্রেরণামূলক। চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে এই উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে, যেখানে অনূর্ধ্ব-১৪ ও ১৬ পর্যায়ের ২২ জন ক্রিকেটার মাঠে দায়িত্ব পালন করছে। শুধু দায়িত্ব নয়, তাদের জন্য স্বাস্থ্যসুরক্ষা, খাবার ও প্রয়োজনীয় সুবিধাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: বৃষ্টির শঙ্কায় কিউইদের ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ

এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে তামিমের নিজের অভিজ্ঞতা। একসময় তিনিও বল বয় হিসেবে মাঠে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের খেলা কাছ থেকে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বিশ্বাস করেন, মাঠের খুব কাছ থেকে খেলা দেখা তরুণদের স্বপ্ন ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে সহায়ক। বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারের সূচনাও এই বাউন্ডারি লাইনের বাইরের অভিজ্ঞতা থেকেই যা তিনি নতুন প্রজন্মের জন্য আবারও উন্মুক্ত করতে চান।

ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করাও তার পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 

তামিম স্বীকার করেছেন, দেশের কিছু তারকা ক্রিকেটারের বিদায়ের পর জনপ্রিয়তায় ধাক্কা লেগেছে। তাই বর্তমান প্রজন্মের খেলোয়াড়দের শিশু-কিশোরদের কাছে ‘নায়ক’ হিসেবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ক্রিকেটের প্রচারণা জোরদার করার কথাও বলেছেন।

সমর্থকদের অভিজ্ঞতা উন্নয়নের বিষয়েও সরাসরি নজর দিয়েছেন তামিম। স্টেডিয়ামে পানির ব্যবস্থা, টয়লেট সুবিধা এবং খাবারের মূল্য নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, ২০০ টাকার টিকিট কেটে আসা একজন দর্শকের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয়। বিশেষ করে মিরপুর স্টেডিয়ামের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চান তামিম। আইসিসি এবং অন্যান্য দেশের ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে বাংলাদেশের ক্রিকেটের লক্ষ্য ও প্রয়োজন তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে তার। বিশ্ব ক্রিকেটকে তিনি একটি পরিবার হিসেবে দেখেন, যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নয়ন সম্ভব।

প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দ্রুত নির্বাচনের দিকেও এগোচ্ছেন তামিম। নির্ধারিত তিন মাসের আগেই বিসিবির নির্বাচন সম্পন্ন করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। একইসঙ্গে নিশ্চিত করেছেন, তিনি নিজেও সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। 

তার মতে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করাই বর্তমান দায়িত্বের অন্যতম প্রধান অঙ্গ।

তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে চ্যালেঞ্জের কথাও স্বীকার করেছেন তামিম। উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে বয়স কম হওয়ায় নেতৃত্ব গ্রহণে অনীহার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবাইকে সম্মান দেখিয়েই কাজ করতে চান। তিনি কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে নয়, বরং সমন্বয়ের মাধ্যমে এগোতে চান।

সব মিলিয়ে, তামিম ইকবালের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এখন একটি রূপান্তরের পথে হাঁটছে যেখানে অগ্রাধিকার পাচ্ছে নিরাপত্তা, পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। মাঠের ভেতর ও বাইরে দুই ক্ষেত্রেই একটি টেকসই ও আস্থাভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলাই তার মূল লক্ষ্য।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়