জাপানে ভূমিকম্পে ধসে পড়া শপিং মলে বহু হতাহতের শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত
জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপে শক্তিশালী ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাতে ভবন, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধসে পড়েছে একটি বড় শপিং মলের অংশবিশেষ। সেখানে বেশ কয়েকজন মানুষ আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে জরুরি উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে আঘাত হানা এই ভূকম্পনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কুমামোতো প্রিফেকচার।
ভূমিকম্পের পরপরই দেশটির বিভিন্ন এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। শুরু হয় উদ্ধার তৎপরতা ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। কয়েকটি এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং কিছু ভবন ধসে পড়েছে।
জাপান আবহাওয়া সংস্থা (জেএমএ) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল কুমামোতো অঞ্চলের কাছে ভূগর্ভের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। জাপানের নিজস্ব ভূমিকম্প পরিমাপ পদ্ধতিতে কয়েকটি এলাকায় সর্বোচ্চ শিন্দো-৭ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) পরবর্তীতে ভূমিকম্পটির মাত্রা ৬ দশমিক ৮ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কুমামোতো প্রিফেকচারের কাশিমা শহরের একটি এইয়ন (Aeon) শপিং মলে। কম্পনের পর ভবনটির দ্বিতীয় তলার একটি অংশ ধসে পড়ে। এর আগে সেখানে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছিল স্থানীয় পুলিশ। উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে অভিযান শুরু করে।
জাপানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, ভূমিকম্পের পর কয়েকটি স্থাপনায় আগুন জ্বলছে, সড়কে বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হয়েছে এবং কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
ভূমিকম্পের পর অন্তত ৫০ জন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। একটি হাসপাতালেই বহু আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া একটি বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের আহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। তবে হতাহতের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, আহত ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো মূল্যায়ন করা হচ্ছে। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে এবং সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড এবং জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের মাঠে নামানো হয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর জাপানের আবহাওয়া সংস্থা কিউশুর উপকূলীয় এলাকায় সুনামি সতর্কতা জারি করেছিল। আশঙ্কা করা হয়েছিল, উপকূলে এক মিটার পর্যন্ত উচ্চতার ঢেউ আঘাত হানতে পারে। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয় এবং বড় ধরনের সুনামির আশঙ্কা নেই বলে জানানো হয়।
আরও পড়ুন: জাপানে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা
তবে জাপানের আবহাওয়া কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের পর আগামী কয়েক দিন বড় ধরনের আফটারশক বা পরাঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি কম্পন অনুভূত হয়েছে, সেসব এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
ভূমিকম্পের প্রভাবে কিউশু অঞ্চলে ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। প্রায় ৪০ হাজারের বেশি বাড়ি ও স্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় বলে স্থানীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ভূমিকম্পের পর কিউশু শিনকানসেনসহ বেশ কয়েকটি রেলসেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। কুমামোতো বিমানবন্দরের রানওয়েও সাময়িক বন্ধ করা হয়। বেশ কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল বা অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মোবাইল নেটওয়ার্কেও সাময়িক বিঘ্ন দেখা দেয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও যোগাযোগ অবকাঠামোর ক্ষতির কারণে কিছু এলাকায় টেলিযোগাযোগ সেবা ব্যাহত হয়েছে বলে অপারেটররা জানিয়েছে।
ভূমিকম্পের পর কুমামোতো অঞ্চলে থাকা বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি তাদের স্থানীয় কারখানার কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। একইভাবে সনি ও ফুজিফিল্মও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর সংশ্লিষ্ট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রগুলো নিরাপদ রয়েছে।
এই ভূমিকম্প আবারও কুমামোতো অঞ্চলের মানুষের মনে ২০১৬ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। ওই বছর পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল। শতাধিক মানুষ নিহত হন এবং হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঐতিহাসিক কুমামোতো দুর্গও তখন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।
এবারের ভূমিকম্পেও ঐতিহাসিক স্থাপনাটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
প্রশান্ত মহাসাগরের রিং অব ফায়ার অঞ্চলে অবস্থানের কারণে জাপান বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। দেশটিতে নিয়মিত ছোট-বড় ভূকম্পন অনুভূত হয়। কঠোর নির্মাণনীতি, আধুনিক প্রযুক্তি ও দুর্যোগ প্রস্তুতির কারণে দেশটি বড় ধরনের ভূমিকম্প মোকাবিলায় বিশ্বের অন্যতম প্রস্তুত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত।
তবে মঙ্গলবারের এই ভূমিকম্পে কুমামোতোসহ কিউশুর বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি, উদ্ধার কার্যক্রম এবং আফটারশকের ঝুঁকি নিয়ে এখনো উদ্বেগ কাটেনি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার ও নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সূত্র: রয়টার্স, এপি, এনএইচকে, জাপান টাইমস, বিবিসি, ডয়েচে ভেলে
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








