বার্লিন প্রাইড প্যারেডে গাড়ি হামলা: নিহত ১, আহত ১৭
ছবি: সংগৃহীত
জার্মানির রাজধানী বার্লিনে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ এলজিবিটিকিউ প্রাইড উৎসব ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে (সিএসডি) উদযাপন চলাকালে জনতার ভিড়ে একটি সাদা গাড়ি তুলে দেওয়ার ঘটনায় অন্তত একজন নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে আটজন গুরুতর এবং অন্তত তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে দমকল বিভাগ।
ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে পরিকল্পিত হামলা বলে মনে করছে পুলিশ। ইতোমধ্যে বার্লিন পুলিশের পরিচিত ইসলামপন্থি চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত এক ব্যক্তিকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
শনিবার (২৫ জুলাই) স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১০টার দিকে ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের অদূরে টিয়ারগার্টেন পার্ক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
সেদিন সারাদিনের বর্ণাঢ্য প্রাইড প্যারেড শেষে হাজারো মানুষ পার্কে সমাপনী অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও সমাবেশে অংশ নিচ্ছিলেন। এমন সময় দ্রুতগতির একটি সাদা রঙের গাড়ি যাকে কেউ ভ্যান, কেউ মিনিভ্যান বা মিনিবাস হিসেবে বর্ণনা করেছেন হঠাৎ করে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে। একের পর এক পথচারীকে ধাক্কা দেওয়ার পর সেটি একটি গাছে আঘাত করে থেমে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চালক সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ফেলে হেঁটে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পরপরই পুরো এলাকাজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। বিপুলসংখ্যক পুলিশ, দমকল ও অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। গুরুতর আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নিতে বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং কয়েকজনকে জরুরি ভিত্তিতে স্থানান্তরের জন্য অস্থায়ী অবতরণস্থলও প্রস্তুত করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে সঙ্গে সঙ্গেই ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে উৎসব বাতিল ঘোষণা করা হয় এবং অংশগ্রহণকারীদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: তেলাপোকাদের সহায়তাকারীর বাড়িতে পুলিশের অভিযান
বার্লিন পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া গাড়িটি খালি অবস্থায় পাওয়া যায়। তদন্তের অগ্রগতিতে একজন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা হয়েছে, যিনি আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন এবং বার্লিনের ইসলামপন্থী উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে বলে পুলিশের তথ্যভাণ্ডারে উল্লেখ আছে।
তবে হামলার উদ্দেশ্য, এটি একক নাকি সংঘবদ্ধ হামলা এবং আদর্শিক উদ্দেশ্য কতটা জড়িত এসব বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে রাজি নয় তদন্তকারীরা। জার্মানিজুড়ে সন্দেহভাজনকে ধরতে ব্যাপক অভিযান চালানো হচ্ছে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎস ঘটনাটিকে ভয়াবহ হামলা আখ্যা দিয়ে নিহতের পরিবারের প্রতি গভীর শোক এবং আহতদের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, যারা এই হামলার জন্য দায়ী, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। বার্লিনের মেয়র কাই ভেগনারও এটিকে একটি মুক্ত, বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী সমাজের ওপর সরাসরি আঘাত বলে উল্লেখ করে হামলার নিন্দা জানান।
বার্ষিক ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে জার্মানির সবচেয়ে বড় এলজিবিটিকিউ অধিকারভিত্তিক আয়োজনগুলোর একটি এবং ইউরোপেরও অন্যতম বৃহৎ প্রাইড উৎসব। ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে স্টোনওয়াল আন্দোলনের স্মরণে ১৯৭৯ সাল থেকে বার্লিনে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রতিবছরের মতো এবারও কয়েক লাখ মানুষ সমতা, মানবাধিকার ও বৈষম্যবিরোধী বার্তা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। সারাদিনের অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে চললেও সমাপনী পর্বে ঘটে যাওয়া এই হামলায় উৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই শোক ও আতঙ্কে পরিণত হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জার্মানিতে জনসমাগমে গাড়ি তুলে দেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। লাইপজিগ, ম্যানহাইম এবং ম্যাগডেবার্গসহ বিভিন্ন শহরে অনুরূপ হামলায় প্রাণহানির ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বার্লিনের সর্বশেষ ঘটনাটিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ কি না, নাকি এর পেছনে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য না করতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে জার্মান পুলিশ।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








