আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:৩৪, ২৬ জুলাই ২০২৬

‘তেলাপোকাদের’ সহায়তাকারীর বাড়িতে পুলিশের অভিযান

‘তেলাপোকাদের’ সহায়তাকারীর বাড়িতে পুলিশের অভিযান

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট-ইউজি) ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছাত্র-যুব আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা ও দমনমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার সরকারি আশ্বাস এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতির পর ৩৬ দিনের টানা অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তবে আন্দোলন শেষ হলেও আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবকদের বিরুদ্ধে পুলিশি তৎপরতা এবং নজরদারির অভিযোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার ও পানীয় বিতরণ করে আলোচনায় আসেন উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা মোহাম্মদ জুনায়েদ। আন্দোলনস্থলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে পানি বিতরণের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পরই তিনি পুলিশের নজরে আসেন বলে দাবি করেছেন। 

তার অভিযোগ, ছবি ভাইরাল হওয়ার পর উত্তর প্রদেশে তার বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালায় এবং তার বাবা ও অপ্রাপ্তবয়স্ক ছোট ভাইকে নিয়ে যায়। একই সময়ে মেরঠে অবস্থিত তার বোনের শ্বশুরবাড়িতেও পুলিশ গিয়ে বোনের শ্বশুর ও দেবরকে আটক করে নিয়ে যায়। 

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য লালানটপকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জুনায়েদ প্রশ্ন তোলেন, আমার অপরাধ কী? আন্দোলনকারীদের পানি ও খাবার দেওয়া কি অপরাধ?

জুনায়েদের অভিযোগ সামনে আসার পর তার প্রতি প্রকাশ্যে সংহতি জানায় ককরোচ জনতা পার্টি। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে দলটি দাবি করে, প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার না করে উত্তর প্রদেশ পুলিশ তাদের স্বেচ্ছাসেবীর পরিবারকে হয়রানি করছে। 

সংগঠনটি জানায়, তারা জুনায়েদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং তাদের আইনি ও সামাজিক সহায়তা দেওয়া হবে।

শুধু দিল্লি নয়, আন্দোলন ঘিরে ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে। মুম্বাই, পুনে ও আশপাশের এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ফোন করে বাড়িতে থাকার নির্দেশ দেওয়া, হোয়াটসঅ্যাপে লাইভ লোকেশন শেয়ার করতে বলা, ভোররাতে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ৩৫(৩) ধারায় নোটিশ পাঠানো এবং পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন আন্দোলনকারীরা। 

তাদের দাবি, অনেককে থানায় না ডেকে ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য বিক্ষোভ ঠেকাতে পরিবারকে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।

মুম্বাই পুলিশের কর্মকর্তারা অবশ্য এসব পদক্ষেপকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের দাবি, তরুণদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এড়ানো এবং ভবিষ্যতে চাকরি, উচ্চশিক্ষা বা পাসপোর্টসংক্রান্ত জটিলতা থেকে রক্ষা করতেই পরিবারকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। 

আরও পড়ুন: আন্দোলন প্রত্যাহার করলো ককরোচ জনতা পার্টি

তবে মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, আদালতের নির্দেশ ছাড়া নাগরিকের লাইভ লোকেশন পর্যবেক্ষণ বা পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আন্দোলনের প্রভাব পশ্চিমবঙ্গেও পৌঁছায়। কলকাতার ধর্মতলায় বামপন্থি ছাত্র সংগঠন ও ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকদের এক বিক্ষোভ মিছিল থেকে কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর হামলা, পানির বোতল ও জুতা নিক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। 

এ ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে গুন্ডা দমন আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর আক্রমণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল নিট-ইউজি এবং অন্যান্য জাতীয় পর্যায়ের ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম এবং শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহিতার দাবিতে। পরে আন্দোলনের পরিধি বিস্তৃত হয়ে শিক্ষাখাতে দুর্নীতি, বেকারত্ব, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়। ছাত্র-যুবকদের পাশাপাশি চিকিৎসক, শিক্ষক, অভিভাবক, বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা স্বেচ্ছাসেবীরাও আন্দোলনে যুক্ত হন। আন্দোলনস্থলে প্রতিদিন খাবার, পানি ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবীদের একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।

দীর্ঘ আলোচনার পর শনিবার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তৃতীয় দফা বৈঠকে সমঝোতা হয়। এরপর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার, ভবিষ্যতে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া, পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনার প্রতিশ্রুতি এবং প্রশ্নফাঁস-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেয়। এসব প্রতিশ্রুতির পর ককরোচ জনতা পার্টি ৩৬ দিনের আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও সংগঠনটির নেতারা স্পষ্ট করেছেন, শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সামাজিক লড়াই শেষ হচ্ছে না।

আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণার পরও দিল্লি ও বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী এবং সমর্থকদের বিরুদ্ধে পুলিশি তৎপরতার অভিযোগ সামনে আসায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সরকার যে কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে, মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ড কি সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? জুনায়েদের পরিবারের ঘটনাকে ঘিরে এই প্রশ্নই এখন আন্দোলন-পরবর্তী ভারতের অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়