এলপিজির বাজারে তীব্র সংকট ও লাগামহীন দাম, ভোক্তার ত্রাহি দশা
ফাইল ছবি
দেশের পাইপলাইন গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদের সংকটের মধ্যেই হঠাৎ করেই সিলিন্ডারজাত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাজারজুড়ে এখন চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক প্রতি মাসে দাম পুনর্নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও খুচরা ও ডিলার পর্যায়ে তা ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারনির্ধারিত দামের চেয়ে সিলিন্ডারপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে, যা নির্ধারিত দামের তুলনায় অন্তত ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। এই কৃত্রিম বা সাপ্লাই চেইনের সংকটে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে। জ্বালানি স্থাপনা ও পণ্যবাহী জাহাজে নিয়মিত হামলার ফলে বিশ্ববাজারে এলপিজির তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং আকাশচুম্বী হয়েছে জাহাজভাড়া।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির আমদানি মূল্য বা সিপির (Contract Price) হার অনেক বেড়ে যাওয়ায় এবং জাহাজের প্রিমিয়াম ও ভাড়া দ্বিগুণ হওয়ায় অনেক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান চাহিদামতো পণ্য আনতে পারছেন না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে যেখানে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল, সেখানে সেপ্টেম্বর মাসের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানি নেমে এসেছে ১ লাখ ১৯ হাজার টনে। এর ফলে বাজারের চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
চলতি সেপ্টেম্বর মাসের জন্য বিইআরসি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে। এছাড়া ৩৩ কেজির দাম ৪ হাজার ৩৬০ টাকা এবং অন্যান্য আকারের সিলিন্ডারের দামও সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। কিন্তু রাজধানীর রামপুরা, বনশ্রী, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, দনিয়া ও মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায়। অনেক এলাকায় আবার পুরোনো সিলিন্ডার পাল্টে অন্য কোম্পানির নতুন সংযোগ নিতে গেলে সিলিন্ডারের জামানতসহ দাম রাখা হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। আবাসিক খাতে গ্যাস-সংযোগ দীর্ঘকাল বন্ধ থাকায় দেশের প্রায় ১ কোটি গ্রাহকের ৮০ শতাংশই এখন রান্নার কাজে পুরোপুরি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ছোট চায়ের দোকানগুলোও এই খাতের বড় ভোক্তা হওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় হু হু করে বাড়ছে।
আরও পড়ুন: পোলট্রি খাদ্যের লাগামহীন দামে দিশাহারা প্রান্তিক খামারিরা
বাজারের এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির জন্য একে অপরকে দুষছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।
অপারেটরদের দাবি, প্ল্যান্ট থেকে তারা সরকারনির্ধারিত দামেই গ্যাস ছাড়ছেন। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের চড়া দাম ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধির কারণে তারা রেশনিং করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, ডিলার ও পরিবেশক পর্যায়ে একটি চক্র পরবর্তী মাসে দাম বাড়ার আশায় বা অধিক মুনাফার লোভে সিলিন্ডার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।
ডিলারদের দাবি, শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি কোম্পানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে। প্ল্যান্টে গ্যাস সংগ্রহ করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বা দিনভর ট্রাক আটকে থাকায় পরিবহন খরচ বহুলাংশে বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হওয়ায় খুচরা পর্যায়েও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের জরিমানার ভয়ে অনেক খুচরা বিক্রেতা দোকান বন্ধ রাখায় বাজারে সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক মাসের আমদানি পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেশে বড় ধরনের ঘাটতি পাওয়ার কথা নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা মূল্য অস্থিরতা থাকলেও সরবরাহ পরিস্থিতির অজুহাতে বাজারে নৈরাজ্য সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। কারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে বা মজুতদারি করছে, তা খতিয়ে দেখে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।
বেসরকারি খাতের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এই বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে বিগত মাসগুলোতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) সরাসরি আমদানির অনুমোদন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যতদিন না থামবে, ততদিন বৈশ্বিক সরবরাহ লাইন পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়া কঠিন। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটপাট রোধ করতে বিইআরসি ও ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের জোরালো তদারকি, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








