News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৯:৩৭, ৫ মার্চ ২০২৬

উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য, তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারের আশঙ্কা

উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য, তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারের আশঙ্কা

ফাইল ছবি

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের প্রভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তেহরানের হুমকির মুখে এই সরু জলপথ দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে নৌ-বাণিজ্যিক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে।

এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার এমনকি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে সতর্কবার্তা এসেছে।

জ্বালানি অর্থনীতিবিদ ও যুক্তরাষ্ট্রের হাস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এড হির্স কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত তেলের অর্ধেক সরবরাহও যদি বন্ধ হয়ে যায়- বিশেষত মার্কিন নৌবাহিনী ট্যাংকারগুলোকে নিরাপদে চলাচল নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে- তাহলে কিছু সময়ের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে উঠে যেতে পারে।

হির্সের ভাষ্য অনুযায়ী, সামরিক উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যেই জ্বালানি বাজারে দৃশ্যমান। হামলার প্রথম দিনেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সোমবার থেকে মঙ্গলবারের মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ডিজেলের দামও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্যাসনির্ভর কিছু দেশ বিকল্প জ্বালানি হিসেবে পেট্রোলিয়াম মজুত করতে শুরু করায় ভবিষ্যতের সরবরাহ অর্ডারেও প্রভাব পড়ছে।

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, এই পরিস্থিতির বড় প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন হির্স।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জ্বালানি সহায়তা চাওয়া হয়েছে: জ্বালানিমন্ত্রী

বিশ্বের তেল পরিবহনের অন্যতম প্রাণরেখা হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান। ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলো এই সরু পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। বৈশ্বিক মোট তেল, কনডেনসেট ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৩০ শতাংশের বেশি এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এই রুট দিয়ে পরিবাহিত তেলের প্রায় ৮২ শতাংশ যায় এশিয়ায়, বাকি অংশ ইউরোপে। চীনের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ২৪ শতাংশও এই পথনির্ভর।

প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করে; ব্যস্ত সময়ে প্রতি ছয় মিনিটে একটি জাহাজ চলাচলের নজির রয়েছে। তবে ইরানে হামলা শুরুর পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। 

জ্বালানি বাজার পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ৪ মার্চ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। 

যদিও ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; কেপলারের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঝুঁকি নিয়েই কিছু জাহাজ এখনো সীমিতভাবে চলাচল করছে।

৩ মার্চ ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। 

আইআরজিসির কমান্ডার-ইন-চিফের সিনিয়র উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি সতর্ক করে বলেন, কোনো জাহাজ এই পথ অতিক্রমের চেষ্টা করলে তা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হবে। 

সংস্থাটির টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আরও দাবি করেন, তেল পাইপলাইনেও হামলা চালানো হবে এবং এক ফোঁটা তেলও অঞ্চল ছাড়তে দেওয়া হবে না; এমন পরিস্থিতিতে তেলের দাম ২০০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

গত সপ্তাহে ইরানে হামলার পর হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি তিনটি তেলবাহী জাহাজ হামলার শিকার হয়, যার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। 
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালিটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি তৈরি হবে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় জ্বালানির দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হবে। তেল বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ায় এর দামের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খল, উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

সার্বিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা এখন কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিশ্ব জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রতিক্রিয়া বহুমাত্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়