ফিরেই জ্বলে উঠলেন মোসাদ্দেক, ৮৬ রানে ঘুরে দাঁড়াল টাইগাররা
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ চার বছরের একবুক অপেক্ষা, উপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে ফিরেই রাজসিক প্রত্যাবর্তন উপহার দিলেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। মিরপুরের চেনা উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে খেললেন ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস। ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ পারফর্ম করে দলে ফেরা এই মিডল অর্ডার ব্যাটারের অপরাজিত ৮৬ রানের ওপর ভর করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে লড়াইয়ের পুঁজি পেয়েছে বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার (০৯ জুন) মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম ম্যাচে টসে হেরে ব্যাটিং করতে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৮৪ রান সংগ্রহ করেছে স্বাগতিকরা। মোসাদ্দেকের দুর্দান্ত কামব্যাকের পাশাপাশি ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ও নাজমুল হোসেন শান্তর দুটি কার্যকরী ফিফটি এই লড়াকু স্কোর গড়তে মূল ভূমিকা পালন করে।
ডাচ-বাংলা ব্যাংক বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে আজ মঙ্গলবার মিরপুরে টস জিতে স্বাগতিকদের ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান অজি অধিনায়ক জশ ইংলিশ। প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে শুরুতেই বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে পেসার নাথান এলিসের বলে স্লিপে থাকা মারনাস লাবুশেনের হাতে ক্যাচ দিয়ে মাত্র ৫ রান করে সাজঘরে ফেরেন ওপেনার সাইফ হাসান। দলীয় ১০ রানে প্রথম উইকেট হারানোর পর দলের হাল ধরেন নাজমুল হোসেন শান্ত এবং অন্য ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। শুরুর চাপ সামলে এই জুটি দ্রুত রান তুলতে থাকে। শান্ত ৯ রানের মাথায় এলিসের বলে স্লিপে লাবুশেনের হাতে জীবন পেয়ে অজি বোলারদের ওপর চড়াও হন।
অন্যদিকে তানজিদ তামিম খেলছিলেন স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ক্রিকেট। এই দুই ব্যাটার দ্বিতীয় উইকেটে ৯১ বলে ৯৬ রানের একটি দুর্দান্ত পার্টনারশিপ গড়েন। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সপ্তম হাফ সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে তানজিদ তামিম ৪৪ বলে ৫৪ রান (৭টি চার ও ১টি ছক্কা) করে এলিসের দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হলে ভাঙে এই জুটি।
তানজিদ তামিমের বিদায়ের পর উইকেটে এসে থিতু হতে পারেননি চারে নামা লিটন দাস। বাউন্ডারি মারার তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে অনিয়মিত স্পিনার ম্যাট রেনশর বলে তার হাতেই ক্যাচ দিয়ে বসেন ৯ বলে মাত্র ৭ রান করা লিটন। লিটনের বিদায়ের কিছুক্ষণ পর সাজঘরের পথ ধরেন থিতু হয়ে যাওয়া নাজমুল হোসেন শান্তও। ফিফটি পেরিয়ে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় ইনিংসের আভাস দিচ্ছিলেন এই বাঁহাতি ইন-ফর্ম ব্যাটার। তবে দলীয় ১৪০ রানের মাথায় ম্যাট রেনশর বলে লংঅফে কুপার কনোলির হাতে ক্যাচ দিয়ে শেষ হয় তাঁর ৮৬ বলে খেলা ৬৭ রানের (৯টি চার ও ১টি ছক্কা) চমৎকার ইনিংসটি। এক উইকেটে ১০৬ রান থেকে মাত্র ৩৪ রানের ব্যবধানে আরও ৩টি উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ দল যখন চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে, তখন ক্রিজে আসেন ৪ বছর পর দলে ফেরা মোসাদ্দেক হোসেন।
আরও পড়ুন: নির্বাচিত হয়েই বিসিবি পরিচালকের পদত্যাগ
প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেনের ‘মিরাজ থাকতে দলে সুযোগ নেই’ এমন মন্তব্য বা দলের বাইরে থাকার দীর্ঘ সময়, কোনো কিছুই দমাতে পারেনি মোসাদ্দেককে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে আবাহনীর হয়ে ৩৩৬ রান ও ১২ উইকেট নিয়ে নির্বাচকদের দেওয়া আস্থার প্রতিদান তিনি দিলেন প্রথম ম্যাচেই। তাওহীদ হৃদয়কে সঙ্গে নিয়ে পঞ্চম উইকেটে ৯০ বলে ৭৫ রানের জুটি গড়ে প্রাথমিক বিপর্যয় সামাল দেন মোসাদ্দেক। অবশ্য এই জুটিতে হৃদয়ের অবদান ছিল অনেকটাই মন্থর, ৫১ বলে ১টি চারের সাহায্যে তিনি করেন ৩১ রান। হৃদয় আউট হওয়ার পর মোসাদ্দেক মাত্র ৪৯ বলে নিজের চতুর্থ ওয়ানডে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। তবে ফিফটি উদযাপনের পরের বলেই বড় ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ লিয়াম স্কটের বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে ১২ বলে মাত্র ৩ রান করে মাঠ ছাড়েন। ২১৯ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে দল যখন আবারও ৫০ ওভার খেলা নিয়ে ঝুঁকিতে পড়ে, তখন স্লগ ওভারে দলের রানরেট সচল রাখার একক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মোসাদ্দেক।
উইকেট বাঁচিয়ে রান তোলার কঠিন সমীকরণে মোসাদ্দেক বেছে নেন প্রতি আক্রমণের পথ। অ্যাডাম জাম্পার ওভারে রিভার্স সুইপ করে টানা তিন বলে বাউন্ডারিসহ দুই চার ও এক ছক্কা হাঁকিয়ে অজিদের চাপে ফেলেন তিনি। লোয়ার অর্ডারে তানভীর ইসলাম ৭ বলে ৫ রান করে নাথান এলিসের শিকার হলে ক্রিজে আসেন তাসকিন আহমেদ। অষ্টম উইকেটে তাসকিনকে সঙ্গে নিয়ে মাত্র ৩২ বলে ৪৫ রানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝড়ো জুটি গড়েন মোসাদ্দেক। ইনিংসের শেষ বলে তাসকিন আউট হওয়ার আগে করেন ১৬ বলে ২০ রান (২টি চার ও ১টি ছক্কা)। অন্যপ্রান্তে ৭০ বলে ৭টি চার ও ৩টি ছক্কার সাহায্যে ৮৬ রানের ক্যারিয়ারসেরা অনবদ্য ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। শেষ ১০ ওভারে স্বাগতিকরা স্কোরবোর্ডে যোগ করে মূল্যবান ৭০ রান, যার ফলে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ২৮৪ রান (যদিও ভিন্ন খতিয়ানে তাসকিনের শেষ বলে আউটসহ এটি ৮ উইকেটে ২৮৪ রান)।
অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন পেসার নাথান এলিস, তিনি তুলে নেন ৩টি উইকেট। এছাড়া ম্যাট রেনশ এবং লিয়াম স্কট ২টি করে এবং জেভিয়ার বার্টলেট ১টি উইকেট লাভ করেন। মিরপুরের স্পিন সহায়ক কন্ডিশনে অজিদের সামনে জয়ের জন্য ২৮৫ রানের এই লক্ষ্যটি বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, ব্যাট হাতে সফল অলরাউন্ডার মোসাদ্দেক বোলিংয়ে দলকে কতটা ব্রেক-থ্রু এনে দিতে পারেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








