ব্যাটিং বিপর্যয়ে আধুনিক ক্রিকেটে পিছিয়ে বাংলাদেশ
ফাইল ছবি
আধুনিক ক্রিকেটের ব্যাকরণ এখন বদলে গেছে। ওডিআই ফরম্যাটে যেখানে ৪০০ রান ছোঁয়া এখন নিয়মিত নেশায় পরিণত হয়েছে এবং ব্যাটারদের উইলো থেকে নিয়মিত রানের ‘অগ্নিঝরা লাভা’ বেরোচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের ক্রিকেট যেন এক অন্ধকার আদিম গুহায় পথ হারিয়েছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চলমান ওডিআই সিরিজের প্রথম ম্যাচে টাইগারদের ব্যাটিং প্রদর্শনী সেই রূঢ় বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
লিটন-শান্তদের অফ-ফর্ম: পারফরম্যান্সের পাল্লা যখন হালকা
গত শুক্রবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ডিন ফক্সক্রফটের একটি সাধারণ মানের ডেলিভারিতে লিটন দাসের বোল্ড হওয়াটা কেবল একটি উইকেট পতন ছিল না; বরং এটি ছিল আধুনিক ক্রিকেটের গতির কাছে বাংলাদেশের ব্যাটারদের খাবি খাওয়ার এক চূড়ান্ত নিদর্শন। লিটন দাস জাতীয় দলে খেলছেন দীর্ঘ ১১ বছর, অথচ একজন অভিজ্ঞ ওপেনার হিসেবে তার ওয়ানডে গড় এখনো ৩০-এর কোঠায় আটকে থাকাটা বিস্ময়কর। টানা ১৮ ইনিংসে কোনো ফিফটি নেই তার ব্যাটে।
একই দশা দলের অন্যান্য নির্ভরযোগ্যদেরও। সাবেক অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ব্যাটে টানা ১৩ ইনিংস ধরে বড় কোনো স্কোর নেই, যা দলের টপ-অর্ডারের মেরুদণ্ডকে ভঙ্গুর করে দিয়েছে। অন্যদিকে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাট হাতে নিজের নামের বিচার করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
আরও পড়ুন: আনকোরা কিউইদের কাছে ২৬ রানে হারলো বাংলাদেশ
ওয়ানডে যখন ‘শাসন করার খেলা’, বাংলাদেশ তখন ‘রক্ষণাত্মক’
আফগানিস্তানের মতো দলগুলোও যখন পাওয়ার হিটিং দিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের দাপট দেখাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের ব্যাটাররা এখনো ‘উইকেটে পড়ে থাকার’ প্রাচীন তত্ত্বে বিশ্বাসী। গত ম্যাচে আফিফ হোসেনের ৪৯ বলে বাউন্ডারিহীন ২৯ রানের ইনিংসটি আধুনিক ওয়ানডের প্রেক্ষাপটে প্রায় ‘অপরাধ’ সমতুল্য। যেখানে বিশ্বের বড় দলগুলো ৩৫০-৪০০ রান তাড়া করার সাহস দেখায়, সেখানে ২৫০ রানের লক্ষ্য দেখলেই খেই হারিয়ে ফেলছে টিম বাংলাদেশ।
নেপথ্যে কারণ: ‘মিরপুর সংস্কৃতি’ ও জবাবদিহিতার অভাব
দেশের ক্রিকেটের এই অধঃপতনের পেছনে ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মিরপুরের স্লো এবং লো বাউন্সের উইকেটকে প্রধানত দায়ী করছেন। ঘরের মাঠে ‘মরা উইকেটে’ জয় পেয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভুগলেও বিদেশের স্পোর্টিং ট্র্যাকে বল যখন বুক সমান উচ্চতায় আসে, তখনই বেরিয়ে পড়ছে টাইগারদের টেকনিকের কঙ্কাল।
পাশাপাশি দলে জবাবদিহিতার অভাবকেও বড় সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। টানা ১৭-১৮ ইনিংস ব্যর্থ হওয়ার পরও কোনো কোনো ক্রিকেটার ‘অটো চয়েস’ হিসেবে দলে টিকে থাকছেন, যা স্কোয়াডের ভেতরের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশকে নষ্ট করছে। যেখানে সৌম্য সরকার, মোসাদ্দেক হোসেন বা সাব্বির রহমানের মতো বিকল্পরা সুযোগের অপেক্ষায় বাইরে থাকছেন, সেখানে নিয়মিত ব্যর্থ হওয়া ক্রিকেটারদের ‘প্রিভিলেজ’ পাওয়া নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
সিরিজ জয় দিয়ে মাঝেমধ্যে ব্যর্থতা ঢাকা দেওয়া গেলেও ব্যাটিংয়ের এই দীর্ঘমেয়াদী মরণদশা দেশের ক্রিকেটের জন্য অশনিসংকেত। বিশ্ব ক্রিকেট যখন রকেট গতিতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ তখন গরুর গাড়ির গতিতে পিছিয়ে পড়ছে। এই রক্ষণাত্মক মানসিকতা এবং প্রথাগত ব্যাটিং কৌশলে আমূল পরিবর্তন না আনলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টাইগারদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








