‘চাঁদাবাজি নয়, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রেই ইউসুফ খুন’
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মিরপুর ১৩ নম্বর ও কাফরুল এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর গোলাগুলি এবং যুবদল কর্মী ইউসুফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, ময়লার টেন্ডার, ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা ও ফুটপাতের চাঁদাবাজির মতো বিষয়গুলোকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, এর সম্পূর্ণ বিপরীত দাবি করেছেন খোদ হামলায় বেঁচে যাওয়া কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু।
তার দাবি, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বা চাঁদাবাজি নয়, বরং আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৪ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে তার প্রার্থিতা ও রাজনৈতিক জনপ্রিয়তাকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক শত্রুতা ও খুনের সুনির্দিষ্ট নীল নকশা।
বুধবার (২৯ জুলাই) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি করেন হাফিজুল ইসলাম বাবু।
লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, গত ২৪ জুলাই (শুক্রবার) রাত ১১টা ১০ মিনিটের দিকে মিরপুর ১৩ নম্বর এলাকায় তাকে সুনির্দিষ্টভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে একদল দুর্বৃত্ত এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। ওই হামলায় কাফরুল থানা যুবদলের কর্মী ইউসুফ ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং আরও দুই ফুটপাত ব্যবসায়ী গুরুতর আহত হন।
সংবাদ সম্মেলনে বাবু দাবি করেন, এই কিলিং মিশন বাস্তবায়নের জন্য ঢাকার বাইরে থেকে ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে পেশাদার খুনিদের ভাড়া করা হয়েছিল। মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী হিসেবে স্থানীয় একটি মার্কেটের সভাপতি তথা কাফরুল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাব্বির দেওয়ান জনিকে অভিযুক্ত করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা সাব্বির দেওয়ান জনির সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া ভাড়াটে খুনি আবির, জিয়ারুল এবং সরাসরি মিশন বাস্তবায়নকারী সিএনজি হাফিজ হিসেবে পরিচিত হাফিজুর রহমান হাফিজসহ একাধিক সন্দেহভাজন ঘাতকের বেশ কিছু ছবি সাংবাদিকদের সামনে প্রদর্শন করা হয়। বাবুর প্রশ্ন, খুনিদের সঙ্গে একই নেতার সরাসরি ও ঘনিষ্ঠ ছবি প্রকাশ্যে থাকার পরও পুলিশ কেন তাকে এখনো পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেফতার করছে না?
ঘটনার পরপরই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে জানানো হয়েছিল যে, স্থানীয় আধিপত্য, বর্জ্য বা বর্জ্য সংগ্রহের ময়লার টেন্ডার, ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা এবং ফুটপাতের চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তবে ডিবির এই বক্তব্যকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার অপচেষ্টা হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবু।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, মিরপুর ১৩ নম্বর এলাকায় আমার বা আমার লোকজনের কোনো ডিশ-ইন্টারনেটের ব্যবসা কিংবা ফুটপাতে চাঁদাবাজির কোনো সিন্ডিকেট নেই। এমনকি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এখনো এই অঞ্চলে ময়লা অপসারণ বা সংগ্রহের কোনো আনুষ্ঠানিক টেন্ডারই আহ্বান করা হয়নি।
তার দাবি, স্থানীয় একটি মার্কেটের অবৈধ গ্যারেজ সিএনজি হাফিজ নামে এক ব্যক্তিকে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল, যা জেনেশুনেই কিলিং মিশন পরিচালনার কাজে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন মার্কেট সভাপতি সাব্বির দেওয়ান জনি। প্রকৃত চক্রান্তকারীদের আড়াল করতেই পুলিশ ও প্রভাবশালী মহল মামলাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চক্রান্ত করছে বলে অভিযোগ তার।
পুলিশ এ পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত সন্দেহে ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে এবং তাদের মধ্যে ৪ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছে।
আরও পড়ুন: মব সংস্কৃতি চালু করেছেন এনসিপি নেতারা: বুলু
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে অন্তর্কোন্দল চলে আসছিল।
তবে হাফিজুল ইসলাম বাবু দাবি করেছেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার তথা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৪ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যে ঘোষণা তিনি দিয়েছিলেন, সেটাই তার প্রতিপক্ষদের গাত্রদাহের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাকে রাজনীত ও নির্বাচন থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দিতেই এই হত্যাকাণ্ডের ছক কষা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে নিজের চরম নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে বাবু বলেন, বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়ে যারা নিজেদের ফায়দা হাসতে চাইছে, তারাই মূলত এই কিলারদের ভাড়া করেছে। আজ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রকৃত অপরাধী ও হত্যাকারীর নাম উচ্চারণ করাও আমার জন্য জীবনঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সময় তিনি কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার এবং নেপথ্যের মূল নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোরালো দাবি জানান।
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে অস্বীকার করেছেন কাফরুল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাব্বির দেওয়ান জনি। গণমাধ্যম ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, শুরু থেকেই তিনি এই ন্যক্কারজনক ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে আসছেন।
প্রকৃত অপরাধীদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, পুলিশ ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তে যদি এই হত্যাকাণ্ডে তার বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়, তবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নিতে তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছেন।
সংবাদ সম্মেলনে নিজের ও অভিযুক্তদের ছবি প্রদর্শনের বিষয়ে সাব্বির দেওয়ান জনি স্পষ্ট করেন যে, হাফিজুল ইসলাম বাবু ২০১৫ সাল দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। রাজনৈতিক সহকর্মী ও স্থানীয় নেতা হিসেবে দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচি এবং কর্মকাণ্ডের সুবাদে একসঙ্গে ছবি থাকা বা ওঠাই স্বাভাবিক। কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে একসঙ্গে ছবি থাকাকে কোনো অপরাধের বা খুনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানোর সুযোগ নেই বলে দাবি করেন তিনি।
রাজধানীর মিরপুর ও কাফরুল এলাকার এই চাঞ্চল্যকর যুবদল কর্মী হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। একদিকে পুলিশ যখন একে স্থানীয় চাঁদাবাজি, আধিপত্য ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের ফল হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক পদ-পদবি ও আসন্ন কাউন্সিলর নির্বাচন কেন্দ্রিক শত্রুতার তত্ত্ব সামনে এনে পুরো ঘটনায় নতুন রাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছেন ভুক্তভোগী যুবদল নেতা। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতারকৃত আসামিদের দেওয়া জবানবন্দি যাচাই-বাছাই করছে এবং নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এই পৈশাচিক খুনের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত সত্য উদঘাটনে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে স্থানীয় এলাকাবাসী ও রাজনৈতিক মহল।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








