মুক্তিযোদ্ধা ও জামায়াত ইস্যুতে মুখোমুখি দুই পক্ষ, উত্তপ্ত সংসদ
ছবি: নিউজবাংলাদেশ
জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং দফায় দফায় হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের জামায়াতে ইসলামী ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কিছু বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদ কক্ষ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হয় এবং সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করতে হয়।
আলোচনার শুরুতে ফজলুর রহমান অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের সদস্যরা তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে “ফজা পাগলা” ধরনের অশালীন মন্তব্য করেছেন। তিনি নিজের বয়স ও অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ৭৮ বছর বয়সী একজন প্রবীণ সংসদ সদস্যকে এ ধরনের ভাষায় আক্রমণ করা দুঃখজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। তিনি দাবি করেন, সংসদের ভেতরে তার প্রতি ব্যক্তিগত অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে, যা তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
এরপর তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কঠোর অবস্থান তুলে ধরে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামীতে যুক্ত হলে তা দ্বিগুণ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। এই মন্তব্যের পরপরই বিরোধী দলীয় সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেন এবং সংসদ কক্ষে ব্যাপক শোরগোল তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পিকার সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বারবার হস্তক্ষেপ করেন।
ফজলুর রহমান বক্তব্যে আরও বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ ও আল-বদর বাহিনীর ভূমিকা ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায়, এবং তাদের নিয়ে সংসদে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা ভুল বার্তা দেয়। একই সঙ্গে তিনি ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে থানা লুট ও পুলিশ হত্যার ঘটনাগুলোর তদন্তের দাবি জানান এবং বলেন, নিরপরাধ পুলিশ সদস্যদের হত্যার বিষয়ে কোনো দায়মুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি হাওর অঞ্চলের উন্নয়নে আলাদা ‘হাওর মন্ত্রণালয়’ গঠনের প্রস্তাবও দেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বিরোধী দলীয় নেতার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জামায়াত-ই-ইসলামী প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, যা সংসদে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। বিরোধী দলীয় সদস্যরা একযোগে প্রতিবাদ শুরু করলে অধিবেশনের পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্পিকার এ সময় সংসদীয় রীতিনীতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সংসদ একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং এখানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সকল সদস্যের দায়িত্ব।
বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান পরে ফ্লোর নিয়ে ফজলুর রহমানের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
তিনি বলেন, নিজের অবদান তুলে ধরতে গিয়ে অন্যের অবদানকে ছোট করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আরও পড়ুন: শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ: ফজলুর রহমান
তিনি অভিযোগ করেন, তার ব্যক্তিগত পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং তাকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি নিয়ে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, যা তার মতে নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।
তিনি আরও বলেন, কে কোন রাজনৈতিক দল করবে তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয় এবং এতে রাষ্ট্র বা কারও হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। এমন মন্তব্যকে তিনি গুরুতর ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা জানান এবং সংসদীয় রেকর্ড থেকে আপত্তিকর অংশ বাদ দেওয়ার (এক্সপাঞ্জ) অনুরোধ করেন।
পরবর্তীতে স্পিকার জানান, উভয় পক্ষের বক্তব্যে যদি কোনো অসংসদীয় অংশ থাকে, তা সংসদীয় রেকর্ড থেকে বাদ দেওয়া হবে।
তিনি সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, সংসদীয় নিয়ম-কানুন মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি এবং এই অধিবেশন সরাসরি সম্প্রচারিত হওয়ায় জনসমক্ষে দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।
ফজলুর রহমান পরবর্তী অংশে পুনরায় বক্তব্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রসঙ্গ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান তুলে ধরেন।
তিনি ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার বিচার হওয়া উচিত এবং কোনো অপরাধকে রাজনৈতিকভাবে আড়াল করা যাবে না। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও দেশের অভ্যন্তরে ষড়যন্ত্র নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমান সংসদে আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধে নিজের অবদান দাবি করতে গিয়ে অন্যদের অবদানকে অস্বীকার বা আঘাত করা উচিত নয়।
তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, তার রাজনৈতিক পরিচয় ও আদর্শ বেছে নেওয়ার অধিকার সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।
অধিবেশনের পুরো সময়জুড়ে দফায় দফায় হট্টগোল, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সংসদ কার্যত অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত স্পিকারের কঠোর হস্তক্ষেপ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বানে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








