রণক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য: হুমকির মুখে প্রবাসী শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ
ফাইল ছবি
ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাতের জেরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। এই যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সেখানে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি কর্মীর ওপর। কর্মসংস্থান বন্ধ হওয়া, নিরাপত্তাহীনতা এবং আকাশপথের অচলাবস্থায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
ইতোমধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশির হতাহতের খবর পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও শ্রমবাজার বিশ্লেষকেরা।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর দেশটির পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানার ঘটনায় অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এর প্রভাবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাক ও লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে; কোথাও কোথাও আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। নিয়মিত উড়োজাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ও ছুটিতে দেশে এসে কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীরা বিপাকে পড়েছেন।
দুবাইয়ে কর্মরত বাংলাদেশি দন্তচিকিৎসক নওরীন মেহজাবীন দীতি জানান, হামলার আশঙ্কায় অনেকেই কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। দিনরাত উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। কখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। যাতায়াতের অনিশ্চয়তার কারণে দেশে ফেরা বা কর্মস্থলে টিকে থাকা- দুই দিকেই সংকট তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের মোট অভিবাসী শ্রমিকের প্রায় ৬৭ শতাংশই যান সৌদি আরবে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে কাতার; এছাড়া কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। ফলে এই অঞ্চল অচল হলে তার সরাসরি অভিঘাত পড়বে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে।
আরও পড়ুন: দুবাই থেকে দেশে ফিরলেন ১৮৯ বাংলাদেশি, দ্বিতীয় ফ্লাইট বিকেলে
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে যেতে পারে, অনেক প্রকল্প স্থগিত হতে পারে এবং কর্মরতদের একটি অংশ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। নতুন কর্মী প্রেরণ কমে গেলে রেমিট্যান্সেও বড় ধাক্কা লাগবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারির পর মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার পুরোপুরি চাঙা করা সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও বর্তমান যুদ্ধ সেই সম্ভাবনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। প্রায় এক কোটিরও বেশি প্রবাসীর পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎসগুলোর একটি। ২০২৫ সালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা অভ্যন্তরীণ সংকটের সময়েও এই আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে পারে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও খাদ্যসংকট মোকাবিলা এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপের মধ্যে রেমিট্যান্সে ধাক্কা লাগলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, বিপুলসংখ্যক শ্রমিক দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হলে কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা উভয় ক্ষেত্রেই চাপ বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. রাফিউদ্দীন আহমেদের মতে, যুদ্ধ যদি আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অর্থনৈতিকভাবে অচল হয়ে পড়তে পারে। এতে সরাসরি যুদ্ধে জড়িত না থেকেও বাংলাদেশ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ বা টিকিটসংক্রান্ত জটিলতায় পড়া প্রবাসীদের তথ্য সংগ্রহ ও সহায়তার জন্য একটি বিশেষ সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, প্রবাসীরা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক; ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে প্রবাসীদের বড় অংশ দ্রুত ও নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা এবং ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার সমাধান চান। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে; পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের ফলে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কায় অনেক ক্ষেত্রেই তারা সংযত অবস্থান নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হয়। তাদের জীবন-জীবিকা, নিরাপত্তা ও উপার্জনের ধারাবাহিকতা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। যুদ্ধের অনিশ্চয়তা, আকাশপথে বিঘ্ন, প্রকল্প স্থগিত এবং নিয়োগে স্থবিরতা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব পড়তে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার, বিকল্প শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং প্রবাসী সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ সময়ের দাবি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যুদ্ধের পরিণতি যাই হোক, মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর শ্রমবাজারের ঝুঁকি নতুন করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এটাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








