ভূমিকম্প মোকাবিলায় ৪১ পয়েন্টে সরঞ্জাম, প্রস্তুত ১০০ স্টেশন
ছবি: সংগৃহীত
দেশের সম্ভাব্য বড় ধরনের ভূমিকম্প বা মেগা ডিজাস্টার মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে একক কোনো কেন্দ্র বা স্টেশনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উদ্ধার তৎপরতা সচল রাখতে জনবল, উদ্ধার সরঞ্জাম ও কমান্ড কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণের অভিনব ও যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, প্রায় ১০০ বছর পরপর বড় স্কেলের তীব্র ভূমিকম্প বা মেগা ডিজাস্টার সংঘটিত হওয়ার ঐতিহাসিক প্রবণতা রয়েছে। বাংলাদেশে বড় স্কেলের একটি ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পের শতবর্ষ পার হয়ে যাওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ভূমিকম্পের তীব্র ঝুঁকি ও আশঙ্কা রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে দুই-তিন দিন আগে পূর্বাভাস পাওয়ার সুযোগ থাকলেও ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এখনও সুনির্দিষ্ট বা কার্যকর পূর্বাভাস দেওয়ার মতো কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে এ ধরনের বিপর্যয় থেকে সুরক্ষার একমাত্র এবং প্রধান উপায় হলো সর্বোচ্চ প্রস্তুতি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ।
যেকোনো বড় দুর্যোগে উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম মূলত সঠিক কমান্ড কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। ভূমিকম্পের মতো আকস্মিক বিপর্যয়ে পুরান ঢাকার পুরোনো সদর দপ্তর ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও যাতে সামগ্রিক কমান্ড ও অপারেশনাল কার্যক্রম এক বিন্দুতেও ব্যাহত না হয়, সে লক্ষ্যেই এই বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে দুজন পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কমান্ড পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মিরপুরে অফিস করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি সদর দপ্তরের মিডিয়া উইংয়ের মূল অংশও সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। মিরপুর-১০-এর ট্রেনিং কমপ্লেক্সের প্রধান কার্যক্রম পূর্বাচলের নতুন মাল্টিপারপাস ট্রেনিং কমপ্লেক্সে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
জাপানি প্রযুক্তিতে ভূমিকম্প প্রতিরোধক নতুন সদর দপ্তর: পুরান ঢাকার বর্তমান সদর দপ্তর ভবনের ঝুঁকি এড়াতে ঢাকার মিরপুরে নির্মাণ করা হচ্ছে একটি সর্বাধুনিক ভূমিকম্প প্রতিরোধক বহুতল বিশিষ্ট নতুন সদর দপ্তর ভবন। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-র সহযোগিতায় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রত্যক্ষ সহায়তায় মিরপুর-১০-এ নির্মিতব্য এই ভবনে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সর্বাধুনিক বেজ আইসোলেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে ভবনটি ৮ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্পেও সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও অক্ষত থাকবে। ২০২৫-২০২৮ সালের মধ্যে এর নির্মাণ ও বাস্তবায়ন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে, যার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন শেষে ফায়ার সার্ভিসের মূল অধিদপ্তর সেখানে স্থানান্তরিত হবে।
সাধারণত ফায়ার সার্ভিসের অন্যান্য স্টেশনে দৈনন্দিন প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল ও সরঞ্জাম থাকলেও অধিকাংশ ভারী অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার সরঞ্জাম হেডকোয়ার্টারেই কেন্দ্রীভূত থাকত। প্রধান কার্যালয় ভবন ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে ধসে পড়লে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এসব মূল্যবান সরঞ্জাম আটকে গিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম পঙ্গু হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এই ঝুঁকি এড়াতে ঢাকা ও এর আশপাশের কৌশলগত ৪১টি পয়েন্টে উদ্ধার সরঞ্জাম সুনির্দিষ্টভাবে বিভাজন করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাজধানী বা আশপাশের কোনো নির্দিষ্ট ফায়ার স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও নিকটস্থ অন্য স্টেশন বা পয়েন্ট থেকে দ্রুত সরঞ্জাম সংগ্রহ করে নির্বিঘ্নে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
বড় ধরনের দুর্যোগে প্রচলিত ফায়ার স্টেশনের জনবল অপ্রতুল হতে পারে এ বিষয়টি মাথায় রেখে বিশেষায়িত স্পেশাল রেসকিউ টিম (SRT) বা বিশেষ উদ্ধার দল গঠন করা হয়েছে।
পূর্বাচল স্পেশাল রেসকিউ টিম: ঢাকার পূর্বাচলে ৫০ থেকে ৬০ সদস্যের একটি সুসজ্জিত বিশেষ রেসকিউ টিম মোতায়েন রাখা হয়েছে, যারা দুর্যোগের পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করবে।
আরও পড়ুন: আজ দেশে আসছে রূপপুরের পারমাণবিক জ্বালানি
বিভাগীয় রেসকিউ টিম: একইভাবে দেশের প্রতিটি বিভাগীয় সদরে পৃথকভাবে ২০ সদস্যের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসআরটি টিম গঠন করা হয়েছে। এই দলগুলোকে কলাপসড স্ট্রাকচার সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অপারেশন (ধসে পড়া ভবনে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজ)-এর ওপর বিশেষ ও উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্পে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভাগীয় শহরের বাইরে থেকে বাছাই করা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ১০০টি ফায়ার স্টেশনকে এয়ারমার্ক বা বিশেষভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মহানগরীর কোনো স্টেশন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হলে এই ১০০টি স্টেশন থেকে তাৎক্ষণিকভাবে জনবল ও উদ্ধার সরঞ্জাম এনে ঢাকায় সহায়তা দেওয়া হবে।
এছাড়া বড় ভূমিকম্পের কারণে সড়ক বা মহাসড়কগুলো ধ্বংসস্তূপ বা যানজটে বন্ধ হয়ে গেলে জরুরি পরিস্থিতিতে আকাশপথে (হেলিকপ্টারে) উদ্ধার সরঞ্জাম ও বিশেষ টিম স্থানান্তরের জন্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সঙ্গেও উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এবং সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্প মোকাবিলা ও জরুরি সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের ধারাবাহিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেগা ডিজাস্টারের মতো চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিসের কী ধরনের আধুনিক ইকুইপমেন্ট ও লজিস্টিক সাপোর্ট প্রয়োজন, তা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং তা সরবরাহের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা মেগা ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে ওয়্যারলেস কভারেজ ও মোবাইল টাওয়ার ধ্বংস হয়ে ফায়ার সার্ভিসের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এই মারাত্মক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অ্যামেচার রেডিও অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আরাব)-এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দেশব্যাপী বিশেষ কমিউনিকেশন এক্সারসাইজ বা মহড়া পরিচালনা করা হয়েছে। বেতার, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ল্যান্ড টেলিফোন লাইন সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে এমন কাল্পনিক সংকট পরিস্থিতি তৈরি করে বিকল্প উপায়ে ফায়ার স্টেশনগুলোর মধ্যে যোগাযোগ সচল রাখার এই মহড়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে এবং বিশেষ করে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের উত্তর-পূর্বাংশ ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই সর্বাত্মক ও সমন্বিত প্রস্তুতি অপরিহার্য। বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষিত জনবলের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নত ছোট-বড় আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, নিয়মিত মহড়া এবং সেগুলোর সঠিক মনিটরিং ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত দেশগুলোর জন্যও বড় ভূমিকম্প মোকাবিলা অত্যন্ত দুরূহ; বাংলাদেশেও পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হতে পারে, তবে বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে প্রস্তুতি অব্যাহত রাখতে হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান জানান, বড় ভূমিকম্পের পর ফায়ার সার্ভিসের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বহুমুখী বিপর্যয় মোকাবিলা করা। বিশেষ করে বহুতল ভবন ধসে মানুষের আটকে পড়া, গ্যাসলাইন ও সিলিন্ডার লিক হয়ে অগ্নিকাণ্ড এবং বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলতে পারে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে সরু রাস্তা, তীব্র যানজট, অপরিকল্পিত ও অবৈধ পার্কিং এবং রাস্তার ওপর জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকারী ও ভারী গাড়িগুলোর ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে। পাশাপাশি, ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কাঠামোগত স্থিতিশীলতা (Structural Stability) যাচাই না করে সরাসরি উদ্ধারকাজে প্রবেশ করা উদ্ধারকর্মীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। তাই দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন, আটকে পড়া ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্তকরণ, জীবন রক্ষায় অগ্রাধিকারভিত্তিক উদ্ধার এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সম্পূর্ণ সমন্বিত পন্থায় কাজ করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্ধারকর্মীদের নিজস্ব নিরাপত্তাও সমানভাবে নিশ্চিত করা হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








