বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বাড়াল সরকার
ফাইল ছবি
দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার এবং যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনমান উন্নয়ন, আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা সুসংহত করার লক্ষ্যে মাসিক সম্মানি ভাতা এবং বিভিন্ন আর্থিক অনুদানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে সরকার।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেট অধিশাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই নতুন সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। সংশোধিত এই নতুন আর্থিক হার আগামী ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সারা দেশে কার্যকর হবে।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ৪৩ নম্বর আইন)-এর ধারা ৩ এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রণীত সংশ্লিষ্ট বিধিমালা ও নীতিমালার আলোকে এই যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের মতে, মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতা, বীরত্বপূর্ণ অবদান এবং ত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের সামাজিক সুরক্ষা বলয়কে আরও অধিকতর জোরদার করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ভাতার পরিমাণ আংশিক বৃদ্ধি পেলেও বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির কথা মাথায় রেখে ভাতাসমূহ সম্মানজনক পরিমাণে উন্নীত করা হয়েছে।
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে অনন্য বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানি ভাতার পাশাপাশি উৎসব ভাতা, বিজয় দিবস ও বাংলা নববর্ষের বিশেষ অনুদানের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা এখন থেকে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা সম্মানি ভাতা পাবেন, যা আগের তুলনায় ৫ হাজার টাকা বেশি। এর সঙ্গে তারা উৎসব ভাতা হিসেবে পাবেন ১০ হাজার টাকা, মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বিশেষ অনুদান হিসেবে ৫ হাজার টাকা এবং বাংলা নববর্ষ ভাতা হিসেবে ২ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মাসিক সম্মানি ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। খেতাবপ্রাপ্ত এই বীর সন্তরা মাসিক ভাতার পাশাপাশি বীর উত্তম খেতাবধারীদের সমপরিমাণে অর্থাৎ উৎসব ভাতা ১০ হাজার টাকা, মহান বিজয় দিবস ভাতা ৫ হাজার টাকা এবং বাংলা নববর্ষ ভাতা ২ হাজার টাকা প্রাপ্ত হবেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও বাসস-এর পরিবেশিত তথ্য অনুযায়ী, খেতাবপ্রাপ্তদের এই বর্ধিত আর্থিক সুবিধা তাঁদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও দৈনন্দিন পারিবারিক চাহিদা মেটাতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারবর্গের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতা থেকে তাঁদের মাসিক ভাতা এবং অন্যান্য অনুদান ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও এক সপ্তাহ
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার মাসিক মূল সম্মানি ভাতা বাবদ ২৩ হাজার টাকা পাবে। এর সঙ্গে প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে ২ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা এবং ৫ হাজার টাকা খাদ্য ভাতা প্রদান করা হবে।
শুধু মাসিক ভাতা ও অনুদানই নয়, শহীদ পরিবারগুলোর জন্য উৎসবের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে উৎসব ভাতা হিসেবে এককালীন ২৩ হাজার টাকা এবং বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আরও ২ হাজার টাকা বিশেষ অনুদান নির্ধারণ করা হয়েছে। শহীদ পরিবারের সদস্যদের আর্থিক স্থায়িত্ব ও সুনিশ্চিত জীবনযাত্রা নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই বরাদ্দগুলো বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
শারীরিক অক্ষমতা ও অসুস্থতার মাত্রা বিবেচনা করে যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চারটি ভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে মাসিক সম্মানি ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা এবং পুনর্বাসনের খরচ মেটাতে এই শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে:
- ক শ্রেণি (৯৬–১০০ শতাংশ অক্ষম): মাসিক সম্মানি ভাতা ৩০,০০০ টাকা। জীবদ্দশায় অতিরিক্ত বিশেষ ভাতাসহ চিকিৎসা সুবিধা প্রদান করা হবে।
- খ শ্রেণি (৬১–৯৫ শতাংশ অক্ষম): মাসিক সম্মানি ভাতা ২৮,০০০ টাকা। নিয়মিত চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হবে।
- গ শ্রেণি (২০–৬০ শতাংশ অক্ষম): মাসিক সম্মানি ভাতা ২৩,০০০ টাকা। নিয়মিত কল্যাণ অনুদান প্রদান করা হবে।
- ঘ শ্রেণি (১–১৯ শতাংশ অক্ষম): মাসিক সম্মানি ভাতা ২০,০০০ টাকা। নিয়মিত কল্যাণ অনুদান প্রদান করা হবে।
তালিকা অনুযায়ী, ক শ্রেণির যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা (যাঁদের অক্ষমতার মাত্রা ৯৬ থেকে ১০০ শতাংশ) সর্বোচ্চ মাসিক ৩০ হাজার টাকা সম্মানি ভাতা পাবেন। এছাড়া খ শ্রেণির (৬১ থেকে ৯৫ শতাংশ অক্ষম) মুক্তিযোদ্ধারা ২৮ হাজার টাকা, গ শ্রেণির (২০ থেকে ৬০ শতাংশ অক্ষম) মুক্তিযোদ্ধারা ২৩ হাজার টাকা এবং ঘ শ্রেণির (১ থেকে ১৯ শতাংশ অক্ষম) যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধারা মাসিক ২০ হাজার টাকা সম্মানি ভাতা পাবেন।
উল্লেখ্য, কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এ বা ক শ্রেণির যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য জীবদ্দশায় অতিরিক্ত ৮ হাজার টাকা করে বিশেষ জীবিকা নির্বাহ ভাতা প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে, যা তাঁদের মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা আর পাবেন না।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ডা. মু. আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকার মুক্তিযুদ্ধের বীর সন্তান এবং তাঁদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং সার্বিক জীবনমান উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে বহুমুখী কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে। সর্বশেষ এই ভাতা বৃদ্ধি সেই চলমান রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেরই একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী অংশ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ২০ জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই বর্ধিত ভাতা ও অনুদান দেশের অসচ্ছল, প্রান্তিক ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ এবং দৈনন্দিন পারিবারিক খরচ মেটাতে বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি আনবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকারের এই কল্যাণমুখী পদক্ষেপ সমাজে তাঁদের ঐতিহাসিক অবদানকে আরও একবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ভূষিত করেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








