নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:৪৫, ২৭ জুলাই ২০২৬

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও এক সপ্তাহ

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও এক সপ্তাহ

ফাইল ছবি

দেশজুড়ে চলমান গ্যাস সংকট আগামী সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তবে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী জনগণের ভোগান্তির জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। 

একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এ সংকট সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্টি হয়নি; একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটির কারণেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

সোমবার (২৭ জুলাই) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে দীর্ঘ মতবিনিময়কালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে, সিএনজি স্টেশনগুলোতে চাপ বেড়ে যাওয়ায় গণপরিবহন ব্যবস্থাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এসব বিষয় সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং সংকট নিরসনে দিন-রাত কাজ করছে।

তিনি বলেন, আমরা জানি দেশের মা-বোনেরা, গৃহিণীরা প্রতিদিন রান্নাবান্নার সময় বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। শিল্পকারখানার উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে জনগণের কাছে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। তাৎক্ষণিক সমাধান দিতে না পারা আমাদের সীমাবদ্ধতা, তবে এক মুহূর্তের জন্যও আমরা কাজ থামিয়ে রাখিনি।

প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের বর্তমান দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর বিপরীতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র এবং আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে গড়ে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। অর্থাৎ স্বাভাবিক সময়েও দেশের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে একটি ঘাটতি রয়েছে। সাম্প্রতিক কারিগরি ত্রুটির কারণে সেই ঘাটতি আরও বেড়ে গেছে।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে কাতার ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত এলএনজি বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) ব্যবহার করে গ্যাসে রূপান্তর করা হয় এবং সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ দেওয়া হয়। এর একটি পরিচালনা করে এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি পরিচালনা করে সামিট এলএনজি টার্মিনাল। গত সপ্তাহে এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত এফএসআরইউতে বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়া গ্যাসের প্রায় অর্ধেক সরবরাহ একযোগে কমে যায়, যার প্রভাব দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ত্রুটি মেরামত সম্ভব হবে। কিন্তু পরে সমস্যা জটিল আকার ধারণ করায় ৪৮ ঘণ্টা অতিক্রম করলেও সমাধান হয়নি। এরপর আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও কারিগরি দল বাংলাদেশে আনা হয়েছে। পেট্রোবাংলা, আরপিজিসিএল, জ্বালানি বিভাগ এবং এক্সিলারেট এনার্জির দেশীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিশেষজ্ঞরা সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছেন। বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টস বিমানযোগে আনা হচ্ছে এবং দ্রুত কাস্টমস ছাড়পত্র দিয়ে মেরামতকাজে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হবে।

আরও পড়ুন: এলএনজি টার্মিনাল বন্ধে গ্যাস সংকট, অনিশ্চিত সরবরাহ

প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ত্রুটিগ্রস্ত এফএসআরইউতে একটি বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। 

তিনি বলেন, দুর্ঘটনার সময় কাছাকাছি একটি এলএনজি কার্গো অবস্থান করছিল। দ্রুত সেটিকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা কিংবা পরিবেশগত ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এলএনজি দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করে রাখার সুযোগ নেই। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী জাহাজে এলএনজি আসে, এফএসআরইউতে তা গ্যাসে রূপান্তরিত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। একটি টার্মিনাল অচল হয়ে যাওয়ায় এলএনজি কার্গোগুলোর সময়সূচিতেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে। তবে সামিট পরিচালিত দ্বিতীয় এফএসআরইউ স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে এবং সেখান থেকে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।

সংকট কাটিয়ে ওঠার সম্ভাব্য সময়সূচি তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কারিগরি মূল্যায়ন অনুযায়ী আগামী সপ্তাহ থেকে ত্রুটিগ্রস্ত এফএসআরইউ থেকে প্রতিদিন ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থায় এই টার্মিনাল থেকে ৫০০ থেকে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। অর্থাৎ প্রথম ধাপে প্রায় ৫০ শতাংশ সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা গেলে পরবর্তী সপ্তাহের মধ্যে শতভাগ সরবরাহ পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

তিনি বলেন, এটি আমাদের বক্তব্য নয়, সংশ্লিষ্ট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে আমরা এই সময়সূচি জানাচ্ছি।

বর্তমান সংকটকে সামনে রেখে সরকার ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদে ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির বিষয়েও আলোচনা চলছে। মধ্যমেয়াদে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আর দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রনির্ভর ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে একটি টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দিলেও জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি না হয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের রি-গ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত এলএনজি কেনার সুযোগ থাকলেও তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। নতুন টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে সেই সীমাবদ্ধতা দূর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ভোলার গ্যাস নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় চাহিদা, শিল্পকারখানা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজন পূরণের পর যদি উদ্বৃত্ত গ্যাস থাকে, তাহলে তা মূল ভূখণ্ডে পাইপলাইনের মাধ্যমে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শেষে সবকিছু অনুকূলে থাকলে প্রায় এক বছরের মধ্যে সেই গ্যাস জাতীয় শিল্পখাত বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লকগুলোতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে নতুন বিডিং রাউন্ড চালু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আগামী নভেম্বরে দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। সফলভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম এগোলে ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে এবং আমদানিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে সরকার আশা করছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং আবাসিক খাতে গ্যাসের ওপর উচ্চমাত্রার নির্ভরতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থার যেকোনো বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ত্রুটি দ্রুত জাতীয় সংকটে রূপ নেয়। ফলে বিকল্প অবকাঠামো, অতিরিক্ত রি-গ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি। বর্তমান সংকটও সেই প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়