নিরাপত্তা ছাড়া বিনিয়োগ সম্ভব নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ ও শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এর উন্নয়নকাজ।
সোমবার (২৭ জুলাই) আয়োজিত এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সরকারের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন যে, এই মেগা প্রকল্পটি কেবল একটি শিল্পাঞ্চল নয়; বরং এটি বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত অংশীদারত্ব, পারস্পরিক আস্থা এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটি বাস্তব রূপায়ণ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুজনেই বিনিয়োগের জন্য আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনোভাবেই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়।
তিনি উল্লেখ করেন, বিনিয়োগকারীরা সবসময় এমন একটি অনুকূল পরিবেশ খোঁজেন যেখানে তাদের পুঁজি এবং জানমালের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত থাকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সামান্যতম শঙ্কাও থাকে, তবে বিদেশি বিনিয়োগ তো দূরের কথা, দেশীয় উদ্যোক্তারাও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, নাশকতা কিংবা শিল্পাঞ্চলে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপতৎপরতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সিইআইজেডসহ দেশের প্রতিটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে সর্বোচ্চ তৎপর রাখা হয়েছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।
আরও পড়ুন: সাবেক রাষ্ট্রপতির আইনি সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে সরকার
এছাড়া বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ইতোমধ্যে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) চালু করেছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা দ্রুততম সময়ে প্রকল্প অনুমোদন, সহজে ইউটিলিটি সংযোগ এবং প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক সহায়তা লাভ করবেন। জি-টু-জি (সরকার-টু-সরকার) চুক্তির আওতায় দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি সময়মতো, স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানানো হয়।
কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে আনোয়ারার এই বিশাল ভূমিতে আজ কেবল একটি প্রকল্পের নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়নি, বরং এটি বাংলাদেশে শিল্প রূপান্তরের এক নতুন ইতিহাসের সূচনা করেছে। জি-টু-জি কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়িত এই শিল্পাঞ্চলটি বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) একটি দীর্ঘমেয়াদি মডেল হিসেবে গড়ে উঠছে। চুক্তি অনুযায়ী এটি ৫০ বছর মেয়াদি কনসেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যার মেয়াদ আরও ৫০ বছর নবায়নের সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রকল্প চালুর মধ্য দিয়ে দেশে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হবে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির স্থানান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। সিইআইজেড পুরোপুরি চালু হলে দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে লাখো বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
উদ্বোধনী ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে দুই দেশের সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের চেয়ারম্যান ওয়াং বেংকিয়াং (বা ওয়াং বেনচিয়ান), চীনা সড়ক ও সেতু করপোরেশনের (সিআরবিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট লি চাংগুই, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত এইচ ই ইয়াও ইয়েন (বা ইয়াও ওয়েন), বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, ভূমি ও পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন (মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন), চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামসহ চট্টগ্রামের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং দুই দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি মেগা প্রকল্পগুলো অর্থনীতির গতিশীলতা ফেরাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে এই বিপুল সম্ভাবনাকে সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রাখার কোনো বিকল্প নেই। সরকার ও বিনিয়োগকারীদের যৌথ অংশগ্রহণে এই শিল্পাঞ্চলটি বাংলাদেশের টেকসই শিল্পায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ার ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








