News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:২৯, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
আপডেট: ১৮:৩০, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

স্কারবরো শোল ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চীন-যুক্তরাষ্ট্র

স্কারবরো শোল ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে চীন-যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ চীন সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি একই সময়ে এ দুই কৌশলগত জলপথ ঘিরে চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা নিয়েছে। স্কারবরো শোল এলাকায় বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং হরমুজ ইস্যুতে ওয়াশিংটনের নৌ-নীতির প্রভাব মিলিয়ে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত স্কারবরো শোল এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে চীন। 

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শোলের প্রবেশমুখে চারটি মাছ ধরার নৌকা, একটি চীনা কোস্টগার্ড বা নৌবাহিনীর জাহাজ এবং একটি ভাসমান বাধা মোতায়েন রয়েছে। ১০ ও ১১ এপ্রিল ধারণ করা ছবিতে এই উপস্থিতি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

ফিলিপাইন পক্ষের দাবি অনুযায়ী, নিজেদের জেলেদের সুরক্ষায় দেশটির কোস্টগার্ডও এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বড় আকারের চীনা টহল জাহাজের কারণে স্থানীয় জেলেদের প্রায়ই ওই এলাকা থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। 

ফিলিপাইন কোস্টগার্ডের মুখপাত্র জে টারিয়েলা জানান, ওই সময় শোলের প্রবেশমুখে প্রায় ৩৫২ মিটার দীর্ঘ ভাসমান ব্যারিয়ার বসানো হয় এবং ভেতরে ও বাইরে একাধিক চীনা সামুদ্রিক মিলিশিয়া ও কোস্টগার্ড জাহাজ অবস্থান করছিল, যা কার্যত প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে।

স্কারবরো শোল, যা ফিলিপাইনে ‘বাহো দে মাসিনলোক’ এবং চীনে ‘হুয়াংইয়ান দ্বীপ’ নামে পরিচিত, দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাছ ধরার অঞ্চল। এটি ফিলিপাইনের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে পড়লেও চীন এর ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে। ২০১৬ সালের আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের রায়ে দক্ষিণ চীন সাগর সংক্রান্ত বিরোধে ফিলিপাইনের অবস্থান সমর্থন করা হলেও স্কারবরো শোলের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ওই রায়ে বলা হয়, চীনের অবরোধ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে বলে রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।

গত বছর চীন ওই এলাকায় একটি জাতীয় প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকা গঠনের অনুমোদন দেয়, যা ফিলিপাইনের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে ‘দখলের অজুহাত’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফিলিপাইন নৌবাহিনীর তথ্যমতে, ৫ থেকে ১২ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ১০টি চীনা কোস্টগার্ড জাহাজ ওই এলাকায় দেখা গেছে। দীর্ঘদিনের এই অমীমাংসিত বিরোধ ২০১২ সালের পর থেকে কার্যত চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন।

আরও পড়ুন: ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির জবাবে পাল্টা ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি চীনের

এদিকে জানুয়ারিতে আমেরিকা ও ফিলিপাইন যৌথ সামরিক মহড়া চালায়, যা দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার ক্রমবর্ধমান সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-নীতির প্রভাব নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ইরানকে চাপে রাখতে নেওয়া মার্কিন নৌ অবরোধ এখন চীনের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও প্রভাব ফেলছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। 

সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে চীনের একটি তেলবাহী জাহাজ প্রবেশ করতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চীনের প্রায় ৪০ শতাংশ তেল সরবরাহ আসে এবং ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেলই চীন কিনে থাকে। ফলে এই রুটে কোনো ধরনের বাধা বেইজিংয়ের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতিতে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করে এবং তা সংঘাত আরও বাড়াবে বলে সতর্ক করে।

কানাডীয় ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক দিমিত্রি লাসকারিস মন্তব্য করেছেন, ইরান ও ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত চাপ চীনের জ্বালানি প্রবেশাধিকার সীমিত করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সরাসরি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার দিকে গড়াতে পারে।

এদিকে সামরিক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চীন উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের নৌ এসকর্ট টাস্কফোর্স আরও শক্তিশালী করতে পারে, যা ইতোমধ্যে গালফ অব এডেন ও ওমান উপসাগর এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। চীনের কাছে বর্তমানে ২৩৪টি যুদ্ধজাহাজ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ২১৯টি, তবে বিমানবাহী রণতরী ও যুদ্ধ অভিজ্ঞতায় যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে রয়েছে বলে সামরিক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই ভিন্ন অঞ্চলের সংকট দক্ষিণ চীন সাগরের স্কারবরো শোল এবং মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত স্বার্থ ক্রমশ একে অপরের মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়