প্রকাশ্যে আরও দুই বিক্ষোভকারীর ফাঁসি দিলো ইরান
ছবি: সংগৃহীত
ইরানের ইসফাহান শহরের শাহিদ আলিখানি স্কয়ারে কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে আরও দুই ব্যক্তির প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ভোরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এ নিয়ে বহুল আলোচিত আলিখানি স্কয়ার মামলায় মোট চারজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো। যদিও জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ দণ্ড স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছিলেন।
ইরানের বিচার বিভাগ-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম মিজান নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই ব্যক্তি হলেন আমিরহোসেন সাফারি হোসেইনাবাদি এবং আবুলফজল সেপাহি বাদজানি। তারা গত জানুয়ারিতে ইসফাহানের আলিখানি স্কয়ারে সংঘটিত সরকারবিরোধী বিক্ষোভ-সহিংসতার ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ওই বিক্ষোভে চারজন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হন এবং অগ্নিসংযোগ ও সহিংস হামলার ঘটনাও ঘটে, যার সঙ্গে অভিযুক্তরা জড়িত ছিলেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই আলিখানি স্কয়ারে ফাঁসির মঞ্চ নির্মাণের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সোমবার রাত থেকেই বিপুলসংখ্যক মানুষ ওই এলাকায় জড়ো হতে শুরু করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ইরান ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকারভিত্তিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, পুরো এলাকা নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। অনেক স্থানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে স্কয়ারজুড়ে বিপুল নিরাপত্তা মোতায়েনের দৃশ্য দেখা গেলেও সেগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এই মামলাটি ইরানে আলিখানি স্কয়ার মামলা নামে পরিচিত। জানুয়ারির বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মোট ১২ জন তরুণকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর আগে ১৯ জুলাই একই মামলায় গলমোহাম্মদ মোহাম্মাদি ও এরফান এসফানদিয়ারির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। সর্বশেষ দুইজনের দণ্ড কার্যকরের ফলে এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চারজনের সাজা কার্যকর হলো। বাকি আটজন এখনও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায় রয়েছেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
আরও পড়ুন: ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা স্থগিত করল ইরান
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ জানুয়ারি ইসফাহানের আলিখানি স্কয়ারে বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা, আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহার, অগ্নিসংযোগ এবং নিহত নিরাপত্তা সদস্যদের মরদেহে আগুন দেওয়ার মতো অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, তারা পরিকল্পিত সহিংসতায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
তবে বিচারপ্রক্রিয়াকে ঘিরে শুরু থেকেই তীব্র বিতর্ক রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার মাই সাতোর নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেন, ১২ জনকে একসঙ্গে রুদ্ধদ্বার আদালতে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রত্যেক অভিযুক্তের পৃথক দায়-দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। তাদের অনেকের বয়স গ্রেফতারের সময় ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ছিল। এছাড়া গোপন বিচার, আইনজীবীদের পর্যাপ্ত সুযোগ না দেওয়া, জোরপূর্বক আদায় করা টেলিভিশন সম্প্রচারিত স্বীকারোক্তি এবং পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ না করার অভিযোগও উঠেছে। এসব কারণে তারা মৃত্যুদণ্ড অবিলম্বে স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, অভিযুক্তদের আইনজীবীরা মামলার নথিপত্রে পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার পাননি। এমনকি পরিবারের সদস্যদের কাছেও রায়ের সম্পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরা হয়নি।
সংগঠনটির মতে, বিচারপ্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি এবং অভিযুক্তদের ন্যায়বিচারের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে।
এদিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ইরানের বিভিন্ন শহরে শোক, ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, প্রকাশ্যে ফাঁসি কার্যকর করে সরকার জনগণের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করতে চাইছে।
অন্যদিকে ইরান সরকার বলছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের জন্য আইন অনুযায়ী শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় এ ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








