নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:১৩, ২৯ জুলাই ২০২৬

হঠাৎ ভিসা বাতিলে আমিরাতে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশিরা

হঠাৎ ভিসা বাতিলে আমিরাতে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশিরা

ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কর্মরত হাজার হাজার প্রবাসী কর্মীর রেসিডেন্সি ভিসা হঠাৎ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বৈধ কাগজপত্র ও কাজের চুক্তি বহাল থাকা সত্ত্বেও কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই ঘটে চলা এই আকস্মিক পদক্ষেপে দেশটিতে অবস্থানরত এবং ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীদের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার ঘটনাগুলো মূলত প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। ছুটিতে দেশে এসে কর্মস্থলে ফেরার পথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কিংবা চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে বহু প্রবাসী জানতে পারছেন যে তাদের ভিসা আর কার্যকর নেই। আবার কেউ কেউ আমিরাতের বিমানবন্দরে পৌঁছে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় জানতে পারছেন তাদের ভিসা বাতিল করা হয়েছে, যার ফলে তাদের জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থানরত এবং কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রায় ৫ হাজার প্রবাসীর ভিসা স্ট্যাটাস অনলাইন সিস্টেমে ক্যানসেলড বা বাতিল দেখাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পাকিস্তান ও নেপালসহ আরও কয়েকটি দেশের কর্মীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভিসা বাতিলের নজির সামনে আসছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার কিংবা দেশটির সংশ্লিষ্ট অভিবাসন কর্তৃপক্ষ (ICP/GDRFA) এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কারণ বা সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ করেনি।

নোয়াখালীর আবুধাবিপ্রবাসী তাহের হোসেনের আট বছরের প্রবাসজীবন ও জীবিকা এই সংকটের শিকার হয়ে এক মুহূর্তে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। দুই বছর পর এক মাসের ছুটিতে দেশে এসে পরিবার ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তিনি যখন নির্ধারিত নিয়মে কর্মস্থলে ফেরেন, তখন আবুধাবি বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে জানতে পারেন তার ভিসা বাতিল হয়ে গেছে। কোনো প্রবেশানুমতি না থাকায় তাকে শেষ পর্যন্ত হতাশা ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে আসতে হয়।

একই ধরনের আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন রাস আল খাইমাহর প্রবাসী এসএম করিমসহ হাজারো শ্রমিক। 

ফেনী ও চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন প্রবাসী জানান, স্থানীয় টাইপিং সেন্টার বা অনলাইন পোর্টাল চেক করেও এই হঠাৎ বাতিলের কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ছয় মাস দেশের বাইরে না থাকার নিয়ম বা স্পন্সর পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সঠিকভাবে মেনে চলা সত্ত্বেও অনেকের ভিসার স্থিতি বাতিল দেখাচ্ছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, এটি কোনো বড় ধরনের ইমিগ্রেশন সিস্টেমের কারিগরি ত্রুটি কিংবা নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কঠোর কোনো কড়াকড়ির ফল।

আরও পড়ুন: সৌদিতে প্রবাসীদের ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কড়া নির্দেশনা

ভিসা বাতিলের এই ভীতিকর পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু চক্র ও এয়ারলাইন্সগুলো ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বা ভিসা বাতিলের শঙ্কা মাথায় নিয়ে তড়িঘড়ি করে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রবাসীরা টিকিটের কাউন্টারে ভিড় করছেন। এই সুযোগে একমুখী (ওয়ানওয়ে) বিমান টিকিটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ সময়ে যে টিকিট ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, তা বর্তমানে বেড়ে ৯০ হাজার থেকে প্রায় ১ লাখ টাকায় ঠেকেছে। একদিকে ভিসা হারানোর তীব্র শঙ্কা, অন্যদিকে চড়া মূল্যে টিকিট কিনতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে প্রবাসীদের।

উদ্ভূত এই সংকট সমাধানে বাংলাদেশ সরকার ও প্রবাসে অবস্থিত মিশনগুলো নড়েচড়ে বসেছে। 

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এটি কেবল বাংলাদেশের একার কোনো সমস্যা নয়, বরং পাকিস্তান ও নেপালের শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের সময় চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেশে প্রত্যাবর্তন সাপেক্ষে কূটনৈতিক চ্যানেলে বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে তোলা হবে বলে জানানো হয়েছে।

আবুধাবিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছে যে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে একটি বিশেষ সেল কাজ করছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ প্রবাসীর আবেদন যাচাইপূর্বক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং আরও ১ হাজার ৪০০ জনের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিসা বাতিলসংক্রান্ত নানা ধরনের গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য রোধে আবুধাবির বাংলাদেশ দূতাবাস একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এটি কোনো কারিগরি ত্রুটি নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের কোনো ধরনের অসত্য তথ্যে কান না দিয়ে এবং দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে আর্থিক লেনদেন না করার কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। যেকোনো তথ্যের জন্য সরাসরি দূতাবাসের অফিসিয়াল চ্যানেল বা নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা পরামর্শ দিয়েছেন, বিমানবন্দরে যাত্রার পূর্বে প্রতিটি প্রবাসীর উচিত আমিরাতের আইসিপি (ICP) কিংবা জিডিআরএফএ (GDRFA) পোর্টালে নিজ নিজ ভিসার সঠিক স্ট্যাটাস অনলাইনে যাচাই করে নেওয়া, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত আর্থিক ও মানসিক হয়রানি এড়ানো সম্ভব হয়। মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে সৃষ্ট এই অচলাবস্থা নিরসনে দ্রুত কূটনৈতিক ও দাপ্তরিক হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী প্রবাসী পরিবারগুলো।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়