নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৫৮, ২৮ জুলাই ২০২৬
আপডেট: ২১:০০, ২৮ জুলাই ২০২৬

ইয়াবার করাল গ্রাসে বাংলাদেশ: আইরিশ টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে আসা অন্ধকার চিত্র

ইয়াবার করাল গ্রাসে বাংলাদেশ: আইরিশ টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে আসা অন্ধকার চিত্র

ফাইল ছবি

বাংলাদেশে মাদক সমস্যার ইতিহাস নতুন নয়। তবে গত এক দশকে যে মাদকটি সবচেয়ে দ্রুত, সবচেয়ে নীরবে এবং সবচেয়ে ভয়াবহভাবে সমাজের ভেতরে শেকড় গেড়েছে, সেটি হলো ইয়াবা। একসময় সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা এই ছোট্ট গোলাপি বা কমলা রঙের ট্যাবলেট এখন দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রামাঞ্চলেও পৌঁছে গেছে। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, সীমান্ত নজরদারি, বিচারিক কঠোরতা এবং বহু অভিযানের পরও ইয়াবার বিস্তার থামেনি; বরং পরিবর্তিত হয়েছে এর সরবরাহব্যবস্থা, বিপণন কৌশল এবং ব্যবহারকারীর ধরন। এখন এটি শুধু একটি মাদক নয় বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, পারিবারিক কাঠামো এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

দেশে মাদকের বিস্তার নিয়ে সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, প্রচলিত গাঁজা, ফেনসিডিল কিংবা হেরোইনের তুলনায় বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অ্যামফেটামিন টাইপ স্টিমুল্যান্টস (ATS), যার প্রধান রূপ ইয়াবা। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইয়াবা ও অন্যান্য এটিএস ট্যাবলেট জব্দের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৪ কোটি ৩৫ লাখের বেশি হয়েছে। একই সময়ে গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিল জব্দের পরিমাণ কমেছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অধিক তৎপরতার প্রতিফলন নয়; বরং দেশে ইয়াবার সরবরাহ ও বাজার উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হওয়ারও ইঙ্গিত।

বাংলাদেশে ইয়াবা নিয়ে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে দ্য আইরিশ টাইমস-এর প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। সেখানে মেটালফ্রিক ছদ্মনামের এক মধ্যবয়স্ক আসক্তের জীবনকাহিনির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে একটি মাদক ধীরে ধীরে একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, সম্পর্ক, কর্মজীবন এবং মানসিক ভারসাম্যকে গ্রাস করে। একসময় যিনি প্রতিদিন নিজের পোষা পাখির যত্ন নিতেন, এখন তিনি বিছানা ছেড়ে উঠতেও অনীহা বোধ করেন। 

তার ভাষায়, এই জিনিসটা আমার মাথা পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে।

থাই ভাষায় ইয়াবা শব্দের অর্থ পাগলা ওষুধ। রাসায়নিকভাবে এটি মূলত মেথামফেটামিন এবং ক্যাফেইনের সমন্বয়ে তৈরি একটি শক্তিশালী সিনথেটিক উত্তেজক মাদক। এটি গ্রহণের পর সাময়িকভাবে শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও কর্মক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হলেও দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক অনিদ্রা, উদ্বেগ, হ্যালুসিনেশন, আক্রমণাত্মক আচরণ, স্মৃতিভ্রংশ, সাইকোসিস, স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং আত্মহত্যাপ্রবণতা পর্যন্ত তৈরি করতে পারে। 

চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত ব্যবহারকারীদের অনেকেই তিন থেকে চার দিন টানা জেগে থাকেন, পরে দীর্ঘ সময় অচেতন ঘুমে থাকেন। এই অস্বাভাবিক জৈবিক চক্র ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ডা. মো. আরিফুজ্জামান মনে করেন, ইয়াবা সমস্যাকে কেবল আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে একটি মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। 

তার মতে, দেশের অধিকাংশ আসক্ত ব্যক্তি আগে থেকেই বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মানসিক আঘাত কিংবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যায় ভুগছিলেন। সাময়িক স্বস্তির আশায় তারা মাদকের দিকে ঝুঁকলেও শেষ পর্যন্ত আরও গভীর আসক্তিতে আটকা পড়ছেন। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশে মাত্র কয়েকশ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দিয়ে এই বিপুল সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ না করলে পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন আসবে না।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, যাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই কোনো ধরনের চিকিৎসা নেন না। সামাজিক লজ্জা, পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞের অভাব, চিকিৎসার ব্যয় এবং সচেতনতার ঘাটতি এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। এর ফলে অনেক তরুণ মানসিক সমস্যার চিকিৎসার পরিবর্তে নেশাজাতীয় দ্রব্যকে সহজ সমাধান হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো ইয়াবা এখন আর শুধু উচ্চবিত্ত বা শহুরে তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পরিবহনশ্রমিক, দিনমজুর, গার্মেন্টস শ্রমিক, শিক্ষার্থী, বেকার যুবক, এমনকি বিভিন্ন পেশাজীবীদের মধ্যেও এর ব্যবহার বাড়ছে। অনেকে দীর্ঘ সময় জেগে কাজ করার জন্য, কেউ কর্মক্ষমতা বাড়ানোর আশায়, আবার কেউ ব্যক্তিগত হতাশা থেকে বেরিয়ে আসার ভুল চেষ্টায় ইয়াবা গ্রহণ শুরু করেন। পরে সেটিই পূর্ণমাত্রার আসক্তিতে রূপ নেয়।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের নাম। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা (UNODC) জানিয়েছে, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের সীমান্তবর্তী গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল অঞ্চল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সিনথেটিক মাদক উৎপাদনকেন্দ্র। ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। 

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, জব্দ হওয়া চালানের বাইরে আরও বিপুল পরিমাণ মাদক আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে, যার একটি বড় অংশের গন্তব্য বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ নয়। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি এখন একই সঙ্গে ভোক্তা বাজার এবং ট্রানজিট করিডোরে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত এবং দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের সীমান্ত ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক চক্র নিয়মিত মাদক পাচার করছে। সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের পর দেশের অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছে বহুস্তরবিশিষ্ট সরবরাহব্যবস্থা, যেখানে স্থানীয় চোরাকারবারি, কুরিয়ার নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাও যুক্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তারকে কেবল আসক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর প্রকৃত চিত্র বোঝা যায় না। এর পেছনে রয়েছে বহুজাতিক চোরাচালান চক্র, দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে সক্রিয় অসংখ্য অনুপ্রবেশপথ, প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহব্যবস্থা এবং দেশের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা শক্তিশালী বিতরণ নেটওয়ার্ক। গত এক দশকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাজারো অভিযান, কোটি কোটি ইয়াবা উদ্ধার এবং অসংখ্য গ্রেপ্তারের পরও কেন এই মাদক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সীমান্তপথের বাস্তবতা এবং পাচারকারীদের ক্রমবিবর্তিত কৌশলে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট বাংলাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের অন্তত ১৮টি জেলার ১০৫টির বেশি সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহার করে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ, হেরোইন, ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এসব প্রবেশপথকে মোটামুটি তিনটি প্রধান করিডোরে ভাগ করেছে সংস্থাটি। প্রথমটি ভারতের পশ্চিম সীমান্ত, দ্বিতীয়টি উত্তরাঞ্চলের ভারতীয় সীমান্ত এবং তৃতীয়টি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মিয়ানমার সীমান্ত, যা বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ করিডোর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ভেজাল খাদ্য নিয়ে সত্য কথা বলা কি অপরাধ?

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ২৭১ কিলোমিটার। দীর্ঘ এই সীমান্তের বহু অংশ নদী, পাহাড়, বনাঞ্চল কিংবা দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় সার্বক্ষণিক নজরদারি অত্যন্ত কঠিন। এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগাচ্ছে আন্তর্জাতিক মাদক চক্র। পশ্চিমাঞ্চলে সাতক্ষীরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, কুমিল্লা, ফেনী ও সিলেটের বিভিন্ন সীমান্তপথ ব্যবহার করে ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইন প্রবেশ করে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের টেকনাফ, উখিয়া, শাহপরীর দ্বীপ, তুমব্রু, ঘুমধুম, কুতুপালং ও সেন্টমার্টিন ঘিরে গড়ে উঠেছে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ পাচারের সবচেয়ে বড় করিডোর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবার মূল উৎপাদনকেন্দ্র বাংলাদেশের ভেতরে নয়। অধিকাংশ চালান আসে মিয়ানমারের রাখাইন ও শান অঞ্চলের গোপন সিনথেটিক মাদক কারখানা থেকে। এসব কারখানার বড় অংশ আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা (UNODC) বহু বছর ধরেই সতর্ক করে আসছে, গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মেথামফেটামিন উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবহার করে দেশের বাজারে প্রবেশ করছে।

ডিএনসির কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশে প্রবেশ করা ইয়াবার প্রায় ৮০ শতাংশ দেশীয় বাজারেই খরচ হয়ে যায়। অবশিষ্ট অংশ ছোট ছোট চালানে বিমানবন্দর, কুরিয়ার কিংবা আন্তর্জাতিক যাত্রীদের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন শুধু ট্রানজিট রুট নয়, একই সঙ্গে একটি বড় ভোক্তা বাজারেও পরিণত হয়েছে।

ডিএনসির ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এ কে এম শওকত ইসলাম বলেছেন, গাঁজা ও ফেনসিডিল প্রধানত ভারত থেকে এলেও ইয়াবার প্রধান উৎস মিয়ানমার। 

তার ভাষায়, সীমান্ত অতিক্রমের ক্ষেত্রে অনেক সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কিছু সদস্যকে বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি সংঘবদ্ধ পাচারচক্রের কৌশল; পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পাচারকারীরা দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অর্থের লোভ দেখিয়ে কাজে লাগায়।

সীমান্ত পেরিয়ে ইয়াবা দেশে ঢোকার পরই শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের নেটওয়ার্ক। অতীতে যেখানে বড় বড় চালান ট্রাক কিংবা কাভার্ড ভ্যানে পরিবহন করা হতো, এখন পাচারকারীরা অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন ও ছোট চালানের কৌশল গ্রহণ করেছে। 

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, কেউ ইয়াবা গিলে শরীরের ভেতরে বহন করছে, কেউ জুতার সোলের নিচে, লাঠির ভেতরে, যানবাহনের টায়ারের ফাঁকে কিংবা পণ্যের চালানের সঙ্গে লুকিয়ে আনছে। নারী ও শিশুদেরও অনেক ক্ষেত্রে বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহ কম হয়।

মাদক চোরাকারবারিদের কৌশলেও এসেছে বড় পরিবর্তন। একসময় নির্দিষ্ট স্পট কিংবা ব্যক্তির মাধ্যমে লেনদেন হলেও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করে অর্ডার নেওয়া হয়। অর্থ লেনদেন হয় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস কিংবা অন্য ডিজিটাল মাধ্যমে। এরপর কুরিয়ার সার্ভিস অথবা মোটরসাইকেলচালিত ডেলিভারি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইয়াবা ক্রেতার হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজার এখন ঢাকা। রাজধানীর বিপুল জনসংখ্যা, তুলনামূলক বেশি অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সহজে আত্মগোপনের সুযোগের কারণে মাদকচক্র ঢাকাকেই তাদের প্রধান বাজার হিসেবে ব্যবহার করছে। 

ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের আনুমানিক ৮২ লাখ মাদকাসক্তের মধ্যে প্রায় ২৩ লাখই ঢাকায়। ফলে সীমান্ত থেকে প্রবেশ করা অধিকাংশ চালানের শেষ গন্তব্য রাজধানী।

ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ও উচ্চ আয়ের এলাকাগুলোর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন অঞ্চল, পরিবহন টার্মিনাল, শ্রমঘন এলাকা এবং বিভিন্ন আবাসিক পাড়ায়ও ইয়াবার চাহিদা বাড়ছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট অপরাধচক্রের মাধ্যমে মাদক বিক্রি হতো, এখন অনেক আসক্ত ব্যক্তি নিজের নেশার খরচ জোগাতেই খুচরা বিক্রেতায় পরিণত হচ্ছেন। এতে সরবরাহব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ডিএনসির একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনে করেন, বর্তমানে কক্সবাজার ও যশোর দেশের মাদক প্রবেশের দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে। 

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেছেন, দেশে মাদক ঢুকতে পারার অর্থ সীমান্তের কোথাও না কোথাও নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। 

তার মতে, সীমান্ত দিয়ে একবার মাদক প্রবেশ করলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অস্ত্র, সন্ত্রাস এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের চাপ জেলা পুলিশকেই বহন করতে হয়। অন্যদিকে যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেছেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থানীয় অপরাধচক্রের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় মাদক দমনকে আরও জটিল করে তুলেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইয়াবা এখন শুধু মাদক নয়; এটি একটি উচ্চ মুনাফার অবৈধ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত থেকে রাজধানী পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে রয়েছে আলাদা আলাদা সিন্ডিকেট, পরিবহনকারী, গুদামজাতকারী, খুচরা বিক্রেতা এবং অর্থ সংগ্রহকারী। এই বহুস্তরবিশিষ্ট নেটওয়ার্ক ভেঙে না ফেললে কেবল সীমান্তে অভিযান চালিয়ে ইয়াবার বিস্তার পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হবে না।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়