নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৪৫, ৫ জুন ২০২৬

পদ্মায় তলিয়ে যাওয়া বাস উদ্ধার, বেঁচে গেল ৩৮ প্রাণ

পদ্মায় তলিয়ে যাওয়া বাস উদ্ধার, বেঁচে গেল ৩৮ প্রাণ

ছবি: সংগৃহীত

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়া দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসটি উদ্ধার করা হয়েছে। 

শুক্রবার (০৫ জুন) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘটা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন বাসে থাকা প্রায় ৩৮ জন যাত্রী। মূলত ফেরিতে গাড়ি ওঠার আগে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার সরকারি নিরাপত্তা নির্দেশনা কঠোরভাবে প্রতিপালন করায় এক বুক কাঁপানো বিপর্যয় ও নিশ্চিত প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র দীর্ঘ প্রায় আড়াই ঘণ্টার প্রচেষ্টায় বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে বাসটি টেনে ওপরে তুলতে সক্ষম হন উদ্ধারকর্মীরা। বর্তমানে বাসটিকে উদ্ধার করে দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ঘাটের পন্টুনের ওপর এনে রাখা হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রী নিয়ে ছেড়ে আসে ‘এসবি পরিবহন’-এর একটি নন-এসি বাস। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাসটি দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে এসে পৌঁছায়। ঘাটে দায়িত্বরতদের নির্দেশনা অনুযায়ী চালক ও সহকারী (হেলপার) বাদে বাসের ভেতরে থাকা সব যাত্রীকে আগেই নামিয়ে দেওয়া হয়। এর পরপরই খালি বাসটি ফেরি ‘করবী’তে (নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে ‘কবরী’ উল্লেখ করা হয়েছে) ওঠার চেষ্টা করে। এ সময় বাসটি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুনের কনভেনশন পকেট দিয়ে প্রবেশ করে এবং ফেরির বিপরীত পাশের পেছনের র‌্যাম্প (ডালা) ভেঙে সরাসরি তীব্র স্রোতস্বিনী পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায়।

বাসটি যখন পন্টুন থেকে ছিটকে নদীর তলদেশে তলিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে বাসের চালক ও তার সহকারী অত্যন্ত চটজলদি গাড়ি থেকে লাফিয়ে পানিতে পড়ে যান। পরে স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক সহযোগিতায় তাদের দুজনকে জীবিত অবস্থায় নদী থেকে টেনে তোলা হয় এবং দ্রুত চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বাসের যাত্রী কুষ্টিয়া থেকে আসা হীরক আহমেদ জানান, তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানসহ মোট ৪ জন এই বাসে চড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে আসছিলেন। ঘাটে আসার পর নিয়ম মেনে তারা সবাই নেমে পায়ে হেঁটে ফেরির দিকে যাচ্ছিলেন। ঠিক চোখের সামনেই তাদের বহনকারী বাসটি নদীতে পড়ে যেতে দেখেন তারা। প্রশাসনের এই কড়া নিয়ম না থাকলে আজ হয়তো তাদের সবাইকে সলিল সমাধি নিতে হতো।

আরও পড়ুন: দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফের যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে

এদিকে, দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই উদ্ধারকাজে অংশ নেয় বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি, ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে বিআইডব্লিউটিএ-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’। দীর্ঘক্ষণ ডুবুরি দল ও উদ্ধারকারী জাহাজের সমন্বিত ও নিখুঁত প্রচেষ্টায় বেলা পৌনে ১২টার দিকে বাসটিকে নদীর তলদেশ থেকে টেনে ওপরে দৃশ্যমান করা হয়। বাসটি ওপরে তোলার পর বর্তমানে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেটির ভেতর থেকে যাত্রীদের মূল্যবান মালামাল, ব্যাগ ও লাগেজ বের করে আনার কাজ করছেন। উদ্ধারকৃত এসব সামগ্রী পরবর্তীতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত মালিকদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

এই দুর্ঘটনা ও উদ্ধার অভিযানের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা কাজী আরিফ বিল্লাহর পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মহোদয়গণ এই উদ্ধার অভিযানটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি বিজ্ঞপ্তিতে ফেরিঘাটে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা, যানবাহনের যাত্রীদের আগেভাগে নামিয়ে দেওয়া এবং যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত পথ ব্যবহারের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন এবং বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন নিশ্চিত করেছেন যে, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত কিংবা নিখোঁজের খবর পাওয়া যায়নি। নদীপাড়ে কোনো স্বজনের আহাজারি বা নিখোঁজ থাকার দাবিদারও দেখা যায়নি। তবে বাসটি টেনে তোলা হলেও উদ্ধার অভিযান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়নি। বাসের নিচে বা নদীর তলদেশে কোনো মানুষ কিংবা অন্য কিছু আটকে আছে কি না, তা শতভাগ নিশ্চিত করতে বিআইডব্লিউটিএ এবং ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল পদ্মার তলদেশে নিখুঁতভাবে তল্লাশি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এই তল্লাশি শেষ না হওয়া পর্যন্ত নদীর ভেতরের কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, গত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে একটি যাত্রীবাহী বাস দুর্ঘটনায় ২৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর থেকে ঘাট এলাকায় ফেরিতে ওঠার আগে বাধ্যতামূলকভাবে যাত্রী নামানোর কঠোর নির্দেশনা জারি করে কর্তৃপক্ষ। আজকের এই অলৌকিক বেঁচে যাওয়ার ঘটনা মূলত সেই কঠোর নিয়ম ও সচেতনতারই ফল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়