বিশ্ববাজারে স্বর্ণের বড় দরপতন
ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে শক্তিশালী মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মূলত মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) কর্তৃক সুদের হার কমানোর যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দেয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১৩ মে) স্পট গোল্ডের পাশাপাশি রুপা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামেও উত্থান-পতন লক্ষ্য করা গেছে।
বুধবার আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে লেনদেন শুরুর পর থেকেই স্বর্ণের দাম নিম্নমুখী হতে থাকে। সকাল ৯টা ৪৭ মিনিটে (জিএমটি) প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ০.৪ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৬৯৪ দশমিক ৫৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অথচ এর আগের সেশনেই নিরাপদ বিনিয়োগের এই মাধ্যমটি গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। তবে নতুন অর্থনৈতিক তথ্যের চাপে সেই অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। যদিও স্পট গোল্ডের দাম কমেছে, তবে ফিউচার মার্কেটে সামান্য ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। জুন মাসে ডেলিভারির জন্য মার্কিন স্বর্ণের ফিউচার ০.৩ শতাংশ থেকে ০.৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ৭১৭ দশমিক ৫০ ডলার পর্যন্ত লেনদেন হতে দেখা গেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্বল্প মেয়াদে স্বর্ণের দাম একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ওঠানামা (Sideways movement) করতে পারে।
স্বর্ণের এই দরপতনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভোক্তা মূল্যস্ফীতি (CPI) সংক্রান্ত তথ্য।
মঙ্গলবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান উত্তজনা এবং এর ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইউবিএস-এর বিশ্লেষক জিওভানি স্টাউনোভো জানিয়েছেন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির এই তথ্য ফেডারেল রিজার্ভকে দীর্ঘ সময়ের জন্য উচ্চ সুদহার বজায় রাখতে উৎসাহিত করবে।
আরও পড়ুন: রেকর্ড উচ্চতায় স্বর্ণের দাম
প্রচলিত অর্থনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, সুদের হার বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং ডলার বা বন্ডের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বর্তমানে মার্কিন ডলারের দাম এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোয় বিদেশি ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণ কেনা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, যা সরাসরি চাহিদাহ্রাস ও দাম কমার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজারের অস্থিরতার পেছনে কেবল অর্থনৈতিক তথ্যই নয়, বরং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিও বড় ভূমিকা রাখছে। বিনিয়োগকারীদের এখন মূল দৃষ্টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন বৈঠকের দিকে। বেইজিংয়ে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এই বৈঠকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্প সম্প্রতি এক মন্তব্যে বলেছেন, ইরানের সাথে যুদ্ধ বন্ধে তিনি চীনের সহায়তা অপরিহার্য মনে করেন না।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ইতিমধ্যে ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। এই বৈঠকের ফলাফল বাণিজ্য যুদ্ধ বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তজনা কমিয়ে আনলে স্বর্ণের বাজারে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে।
স্বর্ণের বাজারে পতন থাকলেও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। দিনের শুরুতে স্পট রুপার দাম ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৮৭.৪০ ডলারে পৌঁছেছিল, যা গত ১১ই মার্চের পর সর্বোচ্চ। তবে সেশন শেষে এটি কিছুটা কমে ৮৬.৬১ ডলারে অবস্থান করছে। অন্যদিকে প্ল্যাটিনামের দাম ১.৪ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১৫৬.২৮ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম ০.৭ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫০০.৬২ ডলারে লেনদেন হচ্ছে।
এদিকে বিশ্ববাজারের এই পরিস্থিতির আঁচ লেগেছে বাংলাদেশের বাজারেও। সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭১১ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেট ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭২ টাকা, ১৮ ক্যারেট ২ লাখ ২১৩ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন অব্যাহত থাকলে স্থানীয় বাজারেও দাম পুনর্নির্ধারণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








