News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:৩৫, ৮ মে ২০২৬

রেকর্ড উচ্চতায় স্বর্ণের দাম

রেকর্ড উচ্চতায় স্বর্ণের দাম

ফাইল ছবি

আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমে আসায় আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে স্বর্ণের দাম। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশাবাদ বিশ্ববাজারে মূল্যবান এই ধাতুর বাজারকে নতুন করে চাঙ্গা করেছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। 

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নতুন করে স্বর্ণ ও রুপার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর শুক্রবার (০৮ মে) থেকে দেশের বাজারে ইতিহাসের অন্যতম উচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ।

আন্তর্জাতিক বাজারে শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ৭ মিনিটে স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম ০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৭১৫ দশমিক ৪৯ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে জুন ডেলিভারির জন্য মার্কিন গোল্ড ফিউচারসের দাম ০ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৭২৫ ডলারে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহজুড়ে মূল্যবান ধাতুর বাজারে যে অস্থিরতা ছিল, তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে এবং বিনিয়োগকারীরা আবারও নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আশাবাদ বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

ক্যাপিটাল ডটকমের জ্যেষ্ঠ আর্থিক বাজার বিশ্লেষক Kyle Rodda রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা জানানো হয়েছে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি চুক্তির বিষয়ে এখনও আশাবাদ রয়েছে। এই অবস্থান আপাতত স্বর্ণবাজারকে সমর্থন দিচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াচ্ছে।

তবে বাজার পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর পর থেকে স্বর্ণের দাম ১০ শতাংশেরও বেশি কমে গিয়েছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি। তেলের দাম বাড়লে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি পায়, ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে। উচ্চ সুদের হার সাধারণত স্বর্ণের জন্য নেতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ স্বর্ণ নিজে কোনো সুদ দেয় না। যদিও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে, তবুও স্বল্পমেয়াদে সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা বাজারে চাপ তৈরি করে।

কাইল রডা আরও বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা অধীর আগ্রহে পর্যবেক্ষণ করছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আদৌ কোনো সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারছে কি না। আগামী ২৪ ঘণ্টায় আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের ওঠানামার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেন।

শুধু স্বর্ণ নয়, শুক্রবার বিশ্ববাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও বেড়েছে। রুপার দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ৭৯ দশমিক ৮৫ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৪ দশমিক ২২ ডলারে। এছাড়া প্যালাডিয়ামের দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৫০৮ দশমিক ১৬ ডলারে উঠেছে।

আরও পড়ুন: রেকর্ড দামে স্বর্ণ, ভরি ২.৪৫ লাখ ছুঁইছুঁই

আন্তর্জাতিক বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন বৃহস্পতিবার (০৭ মে) নতুন দর ঘোষণা করে জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ ও রুপার দাম বৃদ্ধির কারণে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুক্রবার সকাল থেকে কার্যকর হওয়া দরে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭১১ টাকায়। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭২ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ২১৩ টাকায় এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৩ টাকা।

এর আগে ৬ মে বাজুস আরেক দফা মূল্য সমন্বয় করেছিল। সে সময় ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা বাড়িয়ে ২ লাখ ৪২ হাজার ৪৯৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। একইসঙ্গে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪০৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি ১ লাখ ৬১ হাজার ৬০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারও দাম বাড়ানোয় বাজারে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম মোট ৬৩ বার সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ দফা দাম বৃদ্ধি এবং ২৮ দফা হ্রাস করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালে মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৪ বার দাম বাড়ানো এবং ২৯ বার কমানো হয়। 

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের ওঠানামা, আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রানীতির কারণে স্বর্ণবাজারে এই অস্বাভাবিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

স্বর্ণের পাশাপাশি দেশের বাজারে রুপার দামও নতুন করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৭৭৪ টাকায়। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম ৫ হাজার ৫৪০ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ৭২৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫৫৮ টাকায়।

রুপার ক্ষেত্রেও চলতি বছরে ব্যাপক মূল্য সমন্বয় হয়েছে। 

বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত রুপার দাম ৩৮ দফা পরিবর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ১৭ বার কমানো হয়েছে। অন্যদিকে গত বছর রুপার দাম মোট ১৩ বার সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১০ বার বৃদ্ধি এবং ৩ বার হ্রাস পায়।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নীতি, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর আগামী দিনগুলোতে স্বর্ণ ও রুপার বাজারের গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করবে। ফলে সামনের দিনগুলোতেও মূল্যবান ধাতুর বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়