News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:১৬, ৮ মে ২০২৬

সমঝোতা ভেস্তে দিয়ে ফের যুদ্ধের পথে ইরান-আমেরিকা

সমঝোতা ভেস্তে দিয়ে ফের যুদ্ধের পথে ইরান-আমেরিকা

ছবি: নিউজবাংলাদেশ (এআই)

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কমে আসার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরুতে অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেও সাম্প্রতিক সামরিক সংঘর্ষে তা আবারও বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। মাত্র কয়েক দিন আগেও যেখানে দুই দেশের মধ্যে এক পৃষ্ঠার একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনার খবর পাওয়া যাচ্ছিল, সেখানে গত ২৪ ঘণ্টার পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা সেই সম্ভাবনাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।

গত ৭ এপ্রিল থেকে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল বলে দাবি করা হলেও, সেই স্থিতিশীলতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সর্বশেষ পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী এলাকায় উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা ও গোলাগুলির ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার বিস্তার ঘটিয়েছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বাহিনীর মধ্যে একাধিক সামরিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। 

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) দাবি করেছে, ইরান-সমর্থিত বাহিনী মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যদিও এতে কোনো জাহাজের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানানো হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় “আত্মরক্ষার” যুক্তি দেখিয়ে ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালানো হয় বলে দাবি ওয়াশিংটনের। 

অন্যদিকে তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে প্রথমে তাদের নৌবাহিনী ও কৌশলগত ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে এবং এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বেসামরিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

ইরানের সামরিক মুখপাত্র দাবি করেছেন, তাদের ভূখণ্ডে হামলার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলরত জাহাজও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, যা তারা গুরুতর উসকানি হিসেবে দেখছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে দুই দেশের পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে। মার্কিন হোয়াইট হাউসের দাবি, ইরানের আক্রমণের জবাবে সীমিত প্রতিরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং এটি কোনোভাবেই যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত নয়। 

আরও পড়ুন: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রে ফের পালটাপালটি হামলা

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেছেন, ইরান যদি দ্রুত কোনো চুক্তিতে না আসে, তবে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। তিনি একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে “উসকানিমূলক আচরণ” করার অভিযোগও তুলেছেন। অপরদিকে ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড সরাসরি আগ্রাসন এবং এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত এপ্রিলের সম্ভাব্য সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ার পেছনে মূলত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে গভীর মতপার্থক্য কাজ করছে। ইরান যেখানে তাদের জব্দকৃত তেলের ট্যাংকার ও অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র এসব শর্তে ছাড় দিতে অনীহা প্রকাশ করছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের শুল্ক বা নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপকে ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী হিসেবে দেখছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর ওপর সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

এই সামরিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ করেই বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এশিয়া ও ইউরোপের শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ দুই পক্ষকেই সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে এবং রাশিয়া মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে, যদিও ওয়াশিংটনের অবস্থানকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক অগ্রগতি অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্লেষকরা “নিম্নমাত্রার সক্রিয় সংঘাত” হিসেবে বর্ণনা করছেন, যেখানে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা না থাকলেও সীমিত আকারে নিয়মিত সামরিক সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। যদিও দুই পক্ষই যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার দাবি করছে, বাস্তব পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ এই সময়ের মধ্যেই কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু না হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় আকারের সংঘাতের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়