News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৫৯, ৬ মার্চ ২০২৬

দেশে ১১-২৮ দিনের জ্বালানি মজুত: সাশ্রয়ী নীতিতে ঝুঁকছে সরকার

দেশে ১১-২৮ দিনের জ্বালানি মজুত: সাশ্রয়ী নীতিতে ঝুঁকছে সরকার

ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল চলমান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রভাব পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় দেশের জ্বালানি মজুত, আমদানি ও বিকল্প উৎস নিয়ে এখন জোরালো আলোচনা চলছে।

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং বিশ্লেষকদের মতে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।

বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা শতভাগই আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে, যার বড় অংশ সরবরাহ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয় ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। তবে এসব দেশও তাদের অধিকাংশ তেল সংগ্রহ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টনের মতো ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে ডিজেলের মজুত প্রায় ১১ দিন, পেট্রল ১২ দিন এবং অকটেনের মজুত প্রায় ২৫ দিনের। একই সঙ্গে অন্য হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান।

গত মঙ্গলবার (০৩ মার্চ) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিপিসি ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, জ্বালানির মধ্যে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রল ১৫ দিন, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিন এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের মজুত রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে গতকাল পর্যন্ত সাতটি জাহাজের আমদানির জন্য এলসি সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া আরও দুটি জাহাজ চট্টগ্রামে তেল নিয়ে এসেছে, যার একটির খালাস শুরু হয়েছে।

বিপিসি জানিয়েছে, পরিশোধিত জ্বালানিতে তাৎক্ষণিক কোনো সংকট না থাকলেও অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যাঘাত ঘটলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। মজুতের বর্তমান পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সরবরাহ না এলে জ্বালানি তেলের মজুত ১৪ থেকে ২১ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে জুন পর্যন্ত দাম নির্ধারিত রয়েছে। অন্য যেসব কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা হচ্ছে, তার প্রভাব এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ওপর পড়ছে না। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের বিষয়টি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহেও। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) জানিয়েছে, দেশে বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ টন আসে কাতার থেকে এবং বাকি অংশ আসে ওমান ও আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে। ইরানের হামলার পর বর্তমানে কাতারে গ্যাস উৎপাদন বন্ধ থাকার খবর পাওয়ায় শিল্পখাতে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: গ্যাস সংকটে ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন কার্যক্রম বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্পকারখানার বয়লার মূলত গ্যাসে চলে, তবে প্রয়োজনে ডিজেল ব্যবহার করেও বয়লার ও জেনারেটর চালাতে হয়। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে এটি শুধু রফতানি খাত নয়, কৃষি খাতের জন্যও বড় দুর্যোগ হয়ে দাঁড়াবে।

অন্যদিকে জ্বালানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস এলপিজির ক্ষেত্রেও নির্ভরতা পুরোপুরি আমদানির ওপর। দেশে বছরে প্রায় ১৪ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, অর্থাৎ প্রতি মাসে প্রয়োজন অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার টন। এই পুরো চাহিদাই মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। ফলে অঞ্চলটিতে দীর্ঘস্থায়ী সংকট দেখা দিলে এলপিজি সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে।

যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনে জ্বালানি কিনতে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেকেই সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় গাড়ির ট্যাংক পূর্ণ করে রাখছেন। বিপিসি কর্মকর্তারা এই পরিস্থিতিকে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে কেনা বলে উল্লেখ করেছেন।

এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি বরাদ্দ ১০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস সরবরাহ প্রতিদিন ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

কৃষি খাতের জন্য সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি ছাড়া দেশের বাকি সব সার কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মজুতদারি ও চোরাচালান ঠেকাতে মাঠে নামানো হয়েছে বিশেষ ভিজিল্যান্স টিম। পাম্প মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা খোলা ড্রাম বা কনটেইনারে কোনোভাবেই জ্বালানি বিক্রি না করেন।

সরকার জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগও নিয়েছে। এ জন্য সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি ও পরিশোধিত তেল সংগ্রহের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে উৎস বৈচিত্র্যের দিকে দ্রুত নজর দেওয়া জরুরি। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে হলেও জ্বালানি কিনতে হতে পারে। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকার দেশবাসীকে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমানো এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও উদাহরণ হিসেবে নিজের দপ্তরে ৫০ শতাংশ বাতি বন্ধ রাখার পাশাপাশি এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নির্ধারণ করেছেন।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক স্থাপনাকে অবিলম্বে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে রান্না ও অন্যান্য কাজে গ্যাসের অপচয় রোধ এবং অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক এই জ্বালানি সংকটে সমন্বিত ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে আগামী দিনগুলো বাংলাদেশের জন্য আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে।

 

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়