News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৩১, ১২ জানুয়ারি ২০২৬
আপডেট: ১৫:৩১, ১২ জানুয়ারি ২০২৬

এডিপি থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট, স্বাস্থ্য ও মেগা প্রকল্পে বড় ধাক্কা

এডিপি থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট, স্বাস্থ্য ও মেগা প্রকল্পে বড় ধাক্কা

ছবি: সংগৃহীত

চলতি অর্থবছরের জন্য সরকারের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। মূল এডিপির তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কাটছাঁট করে মোট বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই সংশোধিত এডিপির অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সংশোধিত এডিপিতে সরকারি অর্থায়ন এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান—উভয় উৎস থেকেই বড় অংকের বরাদ্দ কমানো হয়েছে। সরকারি তহবিল থেকে বরাদ্দ কমেছে ১৬ হাজার কোটি টাকা, যা মূল বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ। অপরদিকে বিদেশি ঋণ ও অনুদান খাত থেকে কমানো হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা, যা প্রায় ১৬ শতাংশের বেশি।

এই কাটছাঁটের ফলে চলতি অর্থবছরে সরকারি অর্থায়নের অংশ নেমে এসেছে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকায় এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার কোটি টাকায়। মূল এডিপিতে মোট বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংশোধিত এডিপি প্রণয়নের সময় মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর নিজস্ব চাহিদাই ছিল তুলনামূলকভাবে কম। তারা সংশোধিত বরাদ্দ হিসেবে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা চেয়েছিল। এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা।

একাধিক প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প পরিচালক না থাকা, নতুন পরিচালক নিয়োগে বিলম্ব এবং বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প সরকারিভাবে পুনর্মূল্যায়নের আওতায় থাকায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছর নির্বাচন বছর হওয়ায় মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

খাতভিত্তিক বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংশোধিত এডিপিতে সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে। এই খাতে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এরপরেই রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, যেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৬ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এছাড়া বাসস্থান ও কমিউনিটি সুবিধা, শিক্ষা এবং স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন খাতেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ১০ দিনে এলো ১১২ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স

তবে বরাদ্দ কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে স্বাস্থ্য খাতে। দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতার কারণে এই খাতে বরাদ্দ প্রায় ৭৪ শতাংশ কমানো হয়েছে। মূল এডিপিতে যেখানে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, সংশোধিত এডিপিতে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকায়। শিক্ষা খাতেও প্রায় ৩৫ শতাংশ বরাদ্দ কমানো হয়েছে।

পরিবহন ও যোগাযোগ খাত মূল এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেলেও সংশোধিত এডিপিতে এখানেও প্রায় ৩৫ শতাংশ অর্থ ছাঁটাই করা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতেও বড় ধরনের কাটছাঁট হয়েছে। এই খাতে মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ১৮ কোটি টাকা, যা সংশোধনের পর কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৪৫ কোটি টাকায়।

বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ এবং কৃষি খাতে প্রায় ২১ শতাংশ। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি সম্পদ খাতে বরাদ্দ প্রায় ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ধর্ম খাতে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ, প্রতিরক্ষা খাতে বেড়েছে ১৩ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকার বিভাগে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।

মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক বরাদ্দের হিসাবে সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এই বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৭ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, যদিও এটি মূল এডিপির তুলনায় কিছুটা কম। এরপর রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং বিদ্যুৎ বিভাগ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ পেয়েছে।

চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে ১০টি মেগা প্রকল্পের মধ্যে ৮টিতেই বরাদ্দ কমানো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট করা হয়েছে মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে। এই প্রকল্পে মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৬৩১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা সংশোধিত এডিপিতে কমিয়ে মাত্র ৮০১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ বরাদ্দ কমেছে ৭ হাজার ৮৩০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বা প্রায় ৯১ শতাংশ।

বরাদ্দ কমার তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্পে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ থেকে ২ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৭৩ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প, যেখানে বরাদ্দ কমানো হয়েছে প্রায় ৭১ শতাংশ।

এছাড়া বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে বরাদ্দ ৪২৫ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১৬৮ কোটি ৬ লাখ টাকা করা হয়েছে। মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পে বরাদ্দ কমেছে ৬০ শতাংশ। এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। হাটিকুমরুল–রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পেও বরাদ্দ কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ।

রেল খাতের প্রকল্পগুলোর মধ্যেও বড় ধরনের কাটছাঁট এসেছে। যমুনা রেল সেতু প্রকল্পে বরাদ্দ ১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৭৭৫ কোটি টাকা বাদ দেওয়া হয়েছে। পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পে ১ হাজার ৮৩ কোটি টাকা থেকে কমানো হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা। সামগ্রিকভাবে রেল খাতে বরাদ্দ কমেছে প্রায় ৫৫ শতাংশ।

সংশোধিত এডিপিতে বিশেষ উন্নয়ন সহায়তার জন্য পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো যুক্ত করলে সংশোধিত এডিপির মোট আকার দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।

এই আরএডিপিতে মোট ১ হাজার ৩৩০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্পের সংখ্যাই বেশি। পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে এসব প্রকল্পের মধ্য থেকে ২৮৬টি প্রকল্প সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এডিপির এই বড় ধরনের কাটছাঁট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। 

তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতার কারণে অন্যান্য বছরের মতো এবারও এডিপিতে অর্থ কমানো হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বড় ধরনের বরাদ্দ হ্রাসকে তিনি উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়